পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৬৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চোখের বালি 88S বিনোদিনী নিজের এই অসহায় অবস্থা যতই সুস্পষ্ট বুঝিল ততই সে মনের মধ্যে বলসঞ্চয় করিতে লাগিল । একটা উপায় তাহাকে করিতেই হইবে, এ-ভাবে তাহার চলিবে না । 譬 ஆ ষেদিন বিহারীর কাছে বিনোদিনী নিজের প্রেম নিবেদন করিয়াছে, সেদিন হইতে তাহার ধৈর্ষের বাধ ভাঙিয়া গেছে । যে উদ্যত চুম্বন বিহারীর মুখের কাছ হইতে সে ফিরাইয়া লইয়া আসিয়াছে, জগতে তাহা কোথাও আর নামাইয়া রাখিতে পারিতেছে না, পূজার অর্ঘ্যের ন্যায় দেবতার উদ্দেশে তাহা রাত্রিদিন বহন করিয়াই রাখিয়াছে। বিনোদিনীর হৃদয় কোনো অবস্থাতেই সম্পূর্ণ হাল ছাড়িয়া দিতে জানে না— নৈরাপ্তকে সে স্বীকার করে না । তাহার মন অহরহ প্রাণপণ বলে বলিতেছে, “আমার এ পূজা বিহারীকে গ্রহণ করিতেই হইবে।” বিনোদিনীর এই দুর্দাস্ত প্রেমের উপরে তাহার আত্মরক্ষার একান্ত আকাঙ্ক্ষা যোগ দিল । বিহারী ছাড়া তাহার আর উপায় নাই। মহেন্দ্রকে বিনোদিনী খুব ভালো করিয়াই জানিয়াছে, তাহার উপরে নির্ভর করিতে গেলে সে ভর সয় না— তাহাকে ছাড়িয়া দিলে তবেই তাহাকে পাওয়া যায়, তাহাকে ধরিয়া থাকিলে সে ছুটিতে চায় । কিন্তু নারীর পক্ষে যে নিশ্চিন্ত বিশ্বস্ত নিরাপদ নির্ভর একাস্ত আবশ্বক, বিহারীই তাহা দিতে পারে। আজ আর বিহারীকে ছাড়িলে বিনোদিনীর একেবারেই চলিবে না । গ্রাম ছাড়িয়া আসিবার দিন তাহার নামের সমস্ত চিঠিপত্র নূতন ঠিকানায় পাঠাইবার জন্য মহেন্দ্রকে দিয়া বিনোদিনী স্টেশনের সংলগ্ন পোস্ট আপিসে বিশেষ করিয়া বলিয়া আসিয়াছিল। বিহারী যে একেবারেই তাহার চিঠির কোনো উত্তর দিবে না, এ-কথা বিনোদিনী কোনোমতেই স্বীকার করিল না— সে বলিল, “আমি সাতটা দিন ধৈর্য ধরিয়া উত্তরের জন্য অপেক্ষা করিব, তাহার পরে দেখা যাইবে ।” এই বলিয়া বিনোদিনী অন্ধকারে জানালা খুলিয়া গ্যাসালোকদীপ্ত কলিকাতার দিকে অন্তমনে চাহিয়া রহিল। এই সন্ধ্যাবেলায় বিহারী এই শহরের মধ্যেই আছে — ইহারই গোটাকতক রাস্তা ও গলি পার হইয়া গেলেই এখনই তাহার দরজার কাছে পৌছানো যাইতে পারে— তাহার পরে সেই জলের কলওয়ালা ছোটো আঙিনা, সেই সিড়ি, সেই মুসজ্জিত পরিপাটি আলোকিত নিভৃত ঘরটি— সেখানে নিস্তব্ধ শাস্তির মধ্যে বিহারী একলা কেদারায় বসিয়া আছে— হয়তো কাছে সেই ব্রাহ্মণবালক, সেই স্বগোল সুন্দর গৌরবর্ণ আয়তনেত্র সরলমূর্তি ছেলেটি নিজের মনে ছৰির বই লইয়া পাতা উলটাইতেছে— একে-একে সমস্ত চিত্রটা মনে করিয়া স্কেহে