পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৭৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8¢रे রবীশ্র-রচনাবলী অনুভব করিল না । সে আজ বিনোদিনীর কলঙ্কপারাবারের মধ্যে তাহার হৃদয়দেবতাকে বিসর্জন দিল ; সেই প্রেমশূন্ত রাত্রির অন্ধকারে তাহার কানের মধ্যে, বুকের মধ্যে, মস্তিকের মধ্যে, তাহার সর্বাঙ্গে রক্তস্রোতের মধ্যে, তাহার চারিদিকের সমস্ত সংসারে, তাহার আকাশের নক্ষত্রে, তাহার প্রাচীরবেষ্টিত নিতৃত ছাদটিতে, তাহার শয়নগৃহের পরিত্যক্ত বিরহশয্যাতলে একটি ভয়ানক গম্ভীর ব্যাকুলতার সঙ্গে বিসর্জনের বাদ্য বাজিতে লাগিল । বিনোদিনীর মহেন্দ্ৰ যেন আশার পক্ষে পরপুরুষ, যেন পরপুরুষেরও অধিক— এমন লজ্জার বিষয় যেন অতি-বড়ো অপরিচিতও নহে । সে কোনোমতেই ঘরে প্রবেশ করিতে পারিল না। একসময় কড়িকাঠ হইতে মহেঞ্জের অন্যমনস্ক দৃষ্টি সম্মুখের দেওয়ালের দিকে নামিয়া আসিল । তাহার দৃষ্টি অনুসরণ করিয়া আশা দেখিল, সম্মুখের দেয়ালে মহেঞ্জের ছবির পাশ্বে ই আশার একখানি ফোটোগ্রাফ ঝুলানো রহিয়াছে। ইচ্ছা হইল, সেখানা আঁচল দিয়া বাপিয়া ফেলে, টানিয়া ছিড়িয়া লইয়া আসে। অভ্যাসবশত কেন যে সেটা চোখে পড়ে নাই, কেন সে যে এতদিন সেটা নামাইয়া ফেলিয়া দেয় নাই, তাহাই মনে করিয়া সে আপনাকে ধিক্কার দিতে লাগিল। তাহার মনে হইল, যেন মহেন্দ্ৰ মনে মনে হাসিতেছে এবং তাহার হৃদয়ের আসনে যে বিনোদিনীর মূর্তি প্রতিষ্ঠিত, সে-ও যেন তাহার জোড়া-ভুরুর ভিতর হইতে ওই ফোটোগ্রাফটার প্রতি সহাত কটাক্ষপাত করিতেছে। অবশেষে বিরক্তিপীড়িত মহেঞ্জের দৃষ্টি দেওয়াল হইতে নামিয়া আসিল । আশা আপনার মুখত ঘুচাইবার জন্য আজকাল সন্ধ্যার সময় কাজকর্ম ও শাশুড়ীর সেবা হইতে অবকাশ পাইলেই অনেকরাত্রি পর্যন্ত নির্জনে অধ্যয়ন করিত। তাহার সেই অধ্যয়নের খাতাপত্ৰবইগুলি ঘরের একধারে গোছানো ছিল । হঠাৎ মহেন্দ্র অলসভাবে তাহার একখানা খাতা টানিয়া লইয়া খুলিয়া দেখিতে লাগিল । আশার ইচ্ছা করিল, চীংকার করিয়া ছুটিয়া সেখানা কাড়িয়া লইয়া আসে । তাহার কাচ-হাতের অক্ষরগুলির প্রতি মহেক্সের হৃদয়হীন বিন্দ্রপদৃষ্টি কল্পনা করিয়া সে আর এক মুহূতওঁ দাড়াইতে পারিল না । ক্রতপদে নিচে চলিয়া গেল— পদশব্দ গোপন করিবার চেষ্টাও ब्रश्लि न । মহেঞ্জের আহার সমস্তই প্রস্তুত হইয়াছিল । রাজলক্ষ্মী মনে করিতেছিলেন, মহেন্দ্র বউমার সঙ্গে রহস্তালাপে প্রবৃত্ত আছে ; সেইজন্য খাবার লইয়া গিয়া মাঝখানে ভঙ্গ দিতে তাহার প্রবৃত্তি হইতেছিল না। আশাকে নিচে আসিতে দেখিয়া তিনি