পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৭৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


868 , 豔 রবীন্দ্র-রচনাবলী আমার এই পরিচয় হইল। শ্রদ্ধাও হারাইলাম, ভালোবাসাও পাইলাম না, আমাকে অপমান করিতে তাহার দ্বিধাও হইল না ?” মহেন্দ্র মশারির সম্মুখে দাড়াইয়া দৃঢ়চিত্তে প্রতিজ্ঞা করিতেছিল, বিনোদিনীর এই স্পধার সে প্রতিবাদ করিবে, যেমন করিয়া হউক আশার প্রতি হৃদয়কে অমুকুল করিয়া বিনোদিনীকৃত অবমাননার প্রতিশোধ দিবে। আশা যেই ঘরে প্রবেশ করিল, মহেঞ্জের অন্যমনস্ক মশারি-ঝাড়া আমনি বন্ধ হইয়া গেল। কী বলিয়া আশার সঙ্গে সে কথা আরম্ভ করিবে, সেই এক অতিদুরূহ সমস্তা উপস্থিত হইল । মহেন্দ্ৰ কাষ্ঠহাসি হাসিয়া, হঠাৎ তাহার যে কথাটা মুখে আসিল তাহাই বলিল । কহিল, “তুমিও দেখিলাম আমার মতো পড়ায় মন দিয়াছ। খাতাপত্র এই যে এখানে দেখিয়াছিলাম, সেগুলি গেল কোথায় ।” কথাটা যে কেবল খাপছাড়া শুনাইল তাহা নহে, আশাকে যেন মারিল । মূঢ় আশা যে শিক্ষিতা হইবার চেষ্টা করিতেছে, সেটা তাহার বড়ো গোপন কথা— আশা স্থির করিয়াছিল, এ-কথাটা বড়োই হাস্যকর । তাহার এই শিক্ষালাভের সংকল্প যদি কাহারও হাস্তবিদ্ধপের লেশমাত্র আভাস হইতেও গোপন করিবার বিষয় হয়, তবে তাহা বিশেষরূপে মহেন্দ্রের। সেই মহেন্দ্র যখন এতদিন পরে প্রথম সম্ভাষণে হাসিয়া সেই কথাটারই অবতারণা করিল, তখন নিষ্ঠুরবেল্লাহত শিশুর কোমল দেহের মতো আশার সমস্ত মনটা সংকুচিত ব্যথিত হইতে লাগিল । সে আর কোনো উত্তর না দিয়া মুখ ফিরাইয়া টিপাইয়ের প্রাস্ত ধরিয়া দাড়াইয়া রহিল । মহেন্দ্রও উচ্চারণমাত্র বুঝিয়াছিল, কথাটা ঠিক সংগত, ঠিক সময়োপযোগী হয় নাই —কিন্তু বত মান অবস্থায় উপযোগী কথাটা যে কী হইতে পারে তাহা মহেন্দ্র কিছুতেই ভাবিয়া পাইল না । মাঝখানের এতবড়ো বিপ্লবের পরে পূর্বের স্তায় কোনো সহজ কথা ঠিকমতে শুনায় না, হৃদয়ও একেবারে মূক, কোনো নূতন কথা বলিবার জন্ত সে প্রস্তুত নহে। মহেন্দ্ৰ ভাবিল, “বিছানার ভিতরে ঢুকিয়া পড়িলে সেখানকার নিভৃত বেষ্টনের মধ্যে হয়তো কথা কওয়া সহজ হইবে।” এই ভাবিয়া মহেন্দ্র আবার মশারির বহির্ভাগ কোচ দিয়া বাড়িতে লাগিল । নূতন অভিনেতা রঙ্গভূমিতে প্রবেশের পূর্বে যেমন উৎকণ্ঠার সঙ্গে নেপথ্যদ্বারে দাড়াইয়া নিজের অভিনেতব্য বিষয় মনে মনে আবৃত্তি করিয়া দেখিতে থাকে, মহেন্দ্র সেইরূপ মশারির সম্মুখে দাড়াইয়া মনে মনে তাহার বক্তব্য ও কর্তব্য আলোচনা করিতে লাগিল। এমন সময় অত্যন্ত মৃদ্ধ একটা শব্দ শুনিয়া মহেন্দ্র মুখ ফিরাইয়া দেখিল, আশা ঘরের মধ্যে নাই ।