পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৮১

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চোখের বালি 84ఏ থাকিতে হয় সেও ভালো।” তাহার ভয় হইতে লাগিল, পাছে তাহার অস্থখ একেবারে সারিয়া যায়। আশাকে ভাড়াইয়া ওষুধ তিনি ফেলিয়া দিতে আরম্ভ করিলেন । o অন্যমনস্ক মহেন্দ্র বড়ো-একটা খেয়াল করিত না । কিন্তু আশা দেখিতে পাইত, রাজলক্ষ্মীর রোগ কিছুই কমিতেছে না, বরঞ্চ ষেন বাড়িতেছে। আশা ভাবিত, মহেন্দ্র যথেষ্ট যত্ন ও চিন্তা করিয়া ঔষধ নির্বাচন করিতেছে না— মহেন্দ্রের মন এতই উদ্রোন্ত যে, মাতার পীড়াও তাহাকে চেতাইয়া তুলিতে পারিতেছে না। মহেঞ্জের এতবড়ো দুৰ্গতিতে আশা তাহাকে মনে মনে ধিক্কার না দিয়া থাকিতে পারিল না । এক দিকে নষ্ট হইলে মানুষ কি সকল দিকেই এমনি করিয়া নষ্ট হয়। একদিন সন্ধ্যাকালে রোগের কষ্টের সময় রাজলক্ষ্মীর বিহারীকে মনে পড়িয়া গেল। কতদিন বিহারী আসে নাই, তাহার ঠিক নাই । আশাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “বউমা, বিহার এখন কোথায় আছে জান ? অাশা বুঝিতে পারিল, চিরকাল রোগতাপের সময় বিহারীই মার সেবা করিয়া আসিয়াছে । তাই কষ্টের সময় বিহারীকেই মাতার মনে পড়িতেছে । হায়, এই সংসারের অটল নির্ভর সেই চিরকালের বিহারীও দূর হইল। বিহারী-ঠাকুরপো থাকিলে এই দুঃসময়ে মার যত্ন হইত— ইহার মতো তিনি হৃদয়হীন নহেন। আশার হৃদয় হইতে দীর্ঘনিশ্বাস পড়িল। রাজলক্ষ্মী । বিহারীর সঙ্গে মহিন বুঝি ঝগড়া করিয়াছে ? বড়ো অন্যায় করিয়াছে বউমা। তাহার মতো এমন হিতাকাঙ্ক্ষী বন্ধু মহিনের আর কেহ নাই । বলিতে বলিতে র্তাহার দুই চক্ষুর কোণে অশ্রুজল জড়ো হইল । একে একে আশার অনেক কথা মনে পড়িল । অন্ধ মূঢ় আশাকে যথাসময়ে সতর্ক করিবার জন্য বিহারী কতরূপে কত চেষ্টা করিয়াছে এবং সেই চেষ্টার ফলে সে ক্রমশই আশার অপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছে, সেই কথা মনে করিয়া আজ আশা মনে মনে নিজেকে তীব্রভাবে অপমান করিতে লাগিল । একমাত্র স্বহৃৎকে লাঞ্ছিত করিয়া একমাত্র শক্রকে যে বক্ষে টানিয়া লয়, বিধাতা সেই কৃতয় মূর্ধকে কেন না শাস্তি দিবেন। ভগ্নহৃদয় বিহারী যে নিশ্বাস ফেলিয়া এ-ঘর হইতে বিদায় হইয়া গেছে, সে-নিশ্বাস কি এ-ঘরকে লাগিবে না । আবার অনেকক্ষণ চিস্তিতমুখে স্থির থাকিয়া রাজলক্ষ্মী হঠাৎ বলিয়া উঠিলেন, “বউমা, বিহারী যদি থাকিত, তবে এই ছুদিনে সে আমাদের রক্ষা করিতে পারিত— এতদূর পর্যন্ত গড়াইতে পাইত না।”