পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৫১৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8ఫి: রবীন্দ্র-রচনাবলী বিহারী তখন ফিরিয়া দাড়াইয়া কহিল, “বিনোদিনী, তোমার জীবনের সঙ্গে আমাকে তুমি জড়াইবার চেষ্টা করিতেছ কেন । আমি তোমার কী করিয়াছি। আমি তো কখনো তোমার পথে দাড়াই নাই, তোমার স্বপদুঃপে হস্তক্ষেপ করি নাই ।” বিনোদিনী কহিল, “তুমি আমার কতখানি অধিকার করিয়াছ, তাহা একবার তোমাকে জানাইয়াছি— তুমি বিশ্বাস কর নাই । তবু আজ আবার তোমার বিরাগের মুখে সেই কথাই জানাইতেছি । তুমি তো আমাকে না বলিয়া জানাইবার, লজ্জা করিয়া জানাইবার, সময় দাও নাই । তুমি আমাকে ঠেলিয়া ফেলিয়াছ, তবু আমি তোমার পা ধরিয়া বলিতেছি, আমি তোমাকে—” বিহারী বাধা দিয়া কহিল, “সে-কথা আর বলিয়ে না, মুখে আনিয়ো না । সে-কথা বিশ্বাস করিবার জো নাই ।” বিনোদিনী । সে-কথা ইতর লোকে বিশ্বাস করিতে পারে না, কিন্তু তুমি করিবে । সেইজন্য একবার আমি তোমাকে বসিতে বলিতেছি । বিহারী । আমি বিশ্বাস করি বা না করি, তাহাতে কী আসে যায় । তোমার জীবন যেমন চলিতেছে, তেমনি চলিবে তো । বিনোদিনী । আমি জানি তোমার ইহাতে কিছুই আসিবে-যাইবে না। আমার ভাগ্য এমন যে, তোমার সম্মানরক্ষা করিয়া তোমার পাশে দাড়াইবার আমার কোনো উপায় নাই । চিরকাল তোমা হইতে আমাকে দূরেই থাকিতে হইবে । আমার মন তোমার কাছে এই দাবিটুকু কেবল ছাড়িতে পারে না যে আমি যেখানে থাকি আমাকে তুমি একটুকু মাধুর্যের সঙ্গে ভাবিবে। আমি জানি, আমার উপরে তোমার অল্প একটু শ্রদ্ধা জন্মিয়াছিল, সেইটুকু আমার একমাত্র সম্বল করিয়া রাখিব । সেইজন্য আমার সব কথা তোমাকে শুনিতে হইবে । আমি হাতজোড় করিয়া বলিতেছি ঠাকুরপো, একটুখানি বসে ।

  • আচ্ছা চলো” বলিয়া বিহারী এখান হইতে অন্তত্ৰে কোথাও যাইতে উদ্যত হইল । বিনোদিনী কহিল, “ঠাকুরপো, যাহা মনে করিতেছ, তাহা নহে । এ-ঘরে কোনো কলঙ্ক স্পর্শ করে নাই । তুমি এই ঘরে এক দিন শয়ন করিয়াছিলে— এ-ঘর তোমার জন্ত উৎসর্গ করিয়া রাখিয়াছি— ওই ফুলগুলা তোমারই পূজা করিয়া আজ শুকাইয়। পড়িয়া আছে। এই ঘরেই তোমাকে বসিতে হইবে।”

শুনিয়া বিহারীর চিত্তে পুলকের সঞ্চার হইল । ঘরের মধ্যে সে প্রবেশ করিল। বিনোদিনী দুই হাত দিয়া তাহাকে খাট দেখাইয়া দিল । বিহারী খাটে গিয়া বসিল – । বিনোদিনী ভূমিতলে তাহার পায়ের কাছে উপবেশন করিল। বিহারী ব্যস্ত হইয়া