পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (তৃতীয় খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৫৩০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


(t ebo রবীন্দ্র-রচনাবলী বিনোদিনী বিহারীকে কহিল, “এখন আমার প্রতি তোমার যাহা আদেশ, তাহা বলে ।” r বিহারী কহিল, “বোঠান, তুমিই বলে, তুমি কী করিতে চাও।” বিনোদিনী কহিল, “শুনিলাম, গরিবদের চিকিৎসার জন্য গঙ্গার ধারে তুমি একখানি বাগান লইয়াছ— আমি সেখানে তোমার কোনো একটা কাজ করিব । কিছু না হয় তো আমি রাধিয়া দিতে পারি।” বিহারী কহিল, “বোঠান, আমি অনেক ভাবিয়াছি । নানান হাঙ্গামে আমাদের জীবনের জালে অনেক জট পড়িয়া গেছে । এখন নিভৃতে বসিয়া বসিয়া তাহারই একটি একটি গ্রন্থি মোচন করিবার দিন আসিয়াছে। পূর্বে সমস্ত পরিষ্কার করিয়া লইতে হইবে । এখন হৃদয় যাহা চায়, তাহাকে আর প্রশ্রয় দিতে সাহস হয় না। এ পর্যন্ত যাহা কিছু ঘটিয়াছে, যাহা কিছু সহ করিয়াছি, তাহার সমস্ত আবর্তন, সমস্ত আন্দোলন শাস্ত করিতে না পারিলে, জীবনের সমাপ্তির জন্য প্রস্তুত হইতে পারিব না। যদি সমস্ত অতীতকাল অমুকুল হইত, তবে সংসারে একমাত্র তোমার দ্বারাই আমার জীবন সম্পূর্ণ হইতে পারিত,— এখন তোমা হইতে আমাকে বঞ্চিত হইতেই হইবে। এখন আর স্বখের জন্য চেষ্টা বৃথা, এখন কেবল আস্তে আস্তে সমস্ত ভাঙচুর সারিয়া লইতে হইবে ।” এই সময় অন্নপূর্ণ ঘরে ঢুকিতেই বিনোদিনী কহিল, “মা, আমাকে তোমার পায়ে স্থান দিতে হইবে । পাপিষ্ঠ। বলিয়া আমাকে তুমি ঠেলিয়ে না।” অন্নপূর্ণ কহিলেন, “মা, চলো, আমার সঙ্গেই চলে ।” অন্নপূর্ণ ও বিনোদিনীর কাশীতে যাইবার দিন কোনো সুযোগে বিহারী বিরলে বিনোদিনীর সহিত দেখা করিল। কহিল, “বোঠান, তোমার একটা-কিছু চিহ্ন আমি কাছে রাখিতে চাই ।” বিনোদিনী কহিল, “আমার এমন কী আছে, যাহা চিহ্নের মতো কাছে রাথিতে পার ?” বিহারী লজ্জা ও সংকোচের সহিত কহিল, “ইংরেজের একটা প্রথা আছে, প্রিয়জনের একগুচ্ছ চুল স্মরণের জন্ত রাখিয়া দেয়— যদি তুমি— ।” বিনোদিনী । ছি ছি, কী ঘৃণা ! আমার চুল লইয়া কী করিবে ! সেই অশুচি মৃতবত্ত আমার এমন কিছুই নহে, যাহা আমি তোমাকে দিতে পারি। আমি ছতভাগিনী তোমার কাজে থাকিতে পারিব না— আমি এমন একটা-কিছু দিতে চাই, যাহা আমার হইয়া তোমার কাজ করিবে— বলে, তুমি লইবে ?