পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ত্রয়োবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৩২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ २२S কিন্তু, এ কী করিতেছি । এ কি একটা গল্প যে উপন্যাস লিখিতে বসিলাম । এমন স্বরে আমার লেখা শুরু হইবে এ আমি কি জানিতাম। মনে ছিল, কয় বৎসরের বেদনার যে মেঘ কালো হইয়া জমিয়া উঠিয়াছে, তাহাকে বৈশাখসন্ধ্যার ঝোড়ো বৃষ্টির মতো প্রবল বর্ষণে নিঃশেষ করিয়া দিব । কিন্তু, না পারিলাম বাংলায় শিশুপাঠ্য বই লিখিতে, কারণ সংস্কৃত মুগ্ধবোধ ব্যাকরণ আমার পড়া নাই ; আর, না পারিলাম কাব্য রচনা করিতে, কারণ মাতৃভাষা আমার জীবনের মধ্যে এমন পুষ্পিত হইয়া উঠে নাই যাহাতে নিজের অস্তরকে বাহিরে টানিয়া আনিতে পারি। সেইজন্যই দেখিতেছি, আমার ভিতরকার শ্মশানচারী সন্ন্যাসীটা অট্টহাস্তে আপনাকে আপনি পরিহাস করিতে বলিয়াছে । না করিয়া করিবে কী । তাহার-ষে আশ্র শুকাইয়া গেছে। জ্যৈষ্ঠের খররৌদ্রই তে। জ্যৈষ্ঠের অশ্রুপূন্ত রোদন। আমার সঙ্গে যাহার বিবাহ হইয়াছিল তাহার সত্য নামটা দিব না। কারণ, পৃথিবীর ইতিহাসে তাহার নামটি লইয়। প্রত্নতাত্বিকদের মধ্যে বিবাদের কোনো আশঙ্কা নাই। ধে তাম্রশাসনে তাহার নাম খোদাই করা আছে সেটা অামার হৃদয়পট । কোনোকালে সে পট এবং সে নাম বিলুপ্ত হইবে, এমন কথা আমি মনে করিতে পারি না । কিন্তু, যে অমৃতলোকে তাহা অক্ষয় হইয়া রহিল সেখানে ঐতিহাসিকের আনাগোনা নাই । আমার এ লেখায় তাহার যেমন হউক একটা নাম চাই । অt চছা, তাহার নাম দিলাম শিশির। কেননা, শিশিরে কান্নাহাসি একেবারে এক হইয়। অাছে, আর শিশিরে ভোরবেলাটুকুর কথা সকালবেলায় আসিয়া ফুরাইয়া যায়। শিশির আমার চেয়ে কেবল দুই বছরের ছোটো ছিল। অথচ, আমার পিতা ষে গৌরীদানের পক্ষপাতী ছিলেন না তাহা নহে । তাহার পিতা ছিলেন উগ্রভাবে সমাজবিদ্রোহী ; দেশের প্রচলিত ধর্মকর্ম কিছুতে তাহার আস্থা ছিল না ; তিনি কষিয়া ইংরাজি পড়িয়াছিলেন । আমার পিতা উগ্রভাবে সমাজের অমুগামী ; মানিতে র্তাহার বাধে এমন জিনিস আমাদের সমাজে, সদরে বা অন্দরে, দেউড়ি বা খিড়কির পথে খুজিয়া পাওয়া দায়, কারণ ইনিও কবিয়া ইংরাজি পড়িয়াছিলেন। পিতামহ এবং পিতা উভয়েরই মতামত বিদ্রোহের দুই বিভিন্ন মূর্তি। কোনোটাই সরল স্বাভাবিক নহে। তবুও বড়ে বয়সের মেয়ের সঙ্গে বাবা ষে আমার বিবাহ দিলেন তাহার কারণ, মেয়ের বয়স বড়ো বলিয়াই পণের অঙ্কটাও বড়ো । শিশির আমার শ্বশুরের একমাত্র মেয়ে । বাবার বিশ্বাস ছিল, কষ্ঠার পিতার সমস্ত টাকা ভাবী জামাতার ভবিষ্যতের গর্ত পূরণ করিয়া তুলিতেছে।