পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ত্রয়োবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৬৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ । ૨૮ ૯ বিবাহের আগের দিন বিন্দু তার নিদিকে গিয়ে বললে "দিদি, আমি তোমাদের গোয়ালঘরে পড়ে থা কব, আমাকে যা বলবে তাই করব, তোমার পায়ে পড়ি আমাকে এমন করে ফেলে দিয়ে না।” কিছুকাল থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে দিদির চোখ দিয়ে জল পড়ছিল, সেদিনও পড়ল । কিন্তু, শুধু হৃদয় তো নয়, শাস্ত্রও আছে। তিনি বললেন, “জানিস তো, বিন্দি, পতিই হচ্ছে স্ত্রীলোকের গতি মুক্তি সব। কপালে যদি দুঃখ থাকে তো কেউ খণ্ডাতে পারবে না ।” আসল কথা হচ্ছে, কোনো দিকে কোনো রাস্তাই নেই– বিন্দুকে বিবাহ করতেই হবে, তার পরে যা হয় তা হোক । আমি চেয়েছিলুম, বিবাহটা যাতে আমাদের বাড়িতেই হয়। কিন্তু, তোমরা ব’লে বসলে, বরের বাড়িতেই হওয়া চাই– সেট। তাদের কৌলিক প্রথা । আমি বুঝলুম, বিন্দুর বিবাহের জন্তে যদি তোমাদের খরচ করতে হয়, তবে সেটা তোমাদের গৃহদেবতার কিছুতেই সইবে না। কাজেই চুপ করে যেতে হল। কিন্তু, একটি কথা তোমরা কেউ জান না। দিদিকে জানাবার ইচ্ছে ছিল কিন্তু জানাই নি, কেননা তাহলে তিনি ভয়েই মরে যেতেন— আমার কিছু কিছু গয়না দিয়ে আমি লুকিয়ে বিন্দুকে সাজিন্ধে দিয়েছিলুম। বোধ করি দিদির চোখে সেটা পড়ে থাকবে, কিন্তু সেট তিনি দেখেও দেখেন নি । দোহাই ধর্মের, সেজন্তে তোমরা তাকে ক্ষমা কোরো। বাবার আগে বিন্দু আমাকে জড়িয়ে ধরে বললে, “দিদি, আমাকে তোমরা তাহলে নিতান্তই ত্যাগ করলে ?” আমি বললুম, “না বিন্দি, তোর যেমন দশাই হোক-না কেন, আমি তোকে শেষ পর্যন্ত ত্যাগ করব না।” তিন দিন গেল। তোমাদের তালুকের প্রজা খাবার জন্যে তোমাকে ষে ভেড়া দিয়েছিল, তাকে তোমার জঠরাগ্নি থেকে বঁচিয়ে আমি আমাদের একতলায় কয়লারাখবার ঘরের এক পাশে বাস করতে দিয়েছিলুম। সকালে উঠেই আমি নিজে তাকে দানা খাইয়ে আসতুম ; তোমার চাকরদের প্রতি দুই-একদিন নির্ভর করে দেখেছি, তাকে খাওয়ানোর চেয়ে তাকে খাওয়ার প্রতিই তাদের বেশি ঝোক । সেদিন সকালে সেই ঘরে ঢুকে দেখি, বিন্দু এক কোণে জড়সড় হয়ে বসে আছে। আমাকে দেখেই আমার পা জড়িয়ে ধরে লুটিয়ে পড়ে নিঃশব্দে কঁদিতে লাগল। বিন্দুর স্বামী পাগল। *সত্যি বলছিস, বিন্দি ?”