পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ত্রয়োবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৬৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


૨૯૭ রবীন্দ্র-রচনাবলী "এত বড়ো মিথ্যা কথা তোমার কাছে বলতে পারি, দিদি ? তিনি পাগল । শ্বশুরের এই বিবাহে মত ছিল না— কিন্তু তিনি আমার শাশুড়িকে যমের মতো ভয় করেন। তিনি বিবাহের পূর্বেই কাণী চলে গেছেন। শাশুড়ি জেদ করে তার ছেলের বিয়ে দিয়েছেন।” আমি সেই রাশ-করা কয়লার উপর বসে পড়লুম। মেয়েমানুষকে মেয়েমানুষ দয়া করে না । বলে, ‘ও তো মেয়েমানুষ বই তো নয়। ছেলে হোক-না পাগল, লে তে। পুরুষ বটে।’ বিন্দুর স্বামীকে হঠাৎ পাগল বলে বোঝা যায় না, কিন্তু এক-একদিন সে এমন উন্মাদ হয়ে ওঠে যে, তাকে ঘরে তালাবন্ধ করে রাখতে হয় । বিবাহের রাত্রে সে ভালো ছিল কিন্তু রাত-জাগা প্রভৃতি উৎপাতে দ্বিতীয় দিন থেকে তার মাথা একেবারে খারাপ হয়ে উঠল। বিন্দু দুপুরবেলায় পিতলের থালায় ভাত খেতে বসেছিল, হঠাৎ তার স্বামী থালামৃদ্ধ ভাত টেনে উঠোনে ফেলে দিলে। হঠাৎ কেমন তার মনে হয়েছে, বিন্দু স্বয়ং রানী রাসমণি ; বেহারাটা নিশ্চয় সোনার থালা চুরি করে রানীকে তার নিজের থালায় ভাত খেতে দিয়েছে । এই তার রাগ । বিন্দু তো ভয়ে মরে গেল। তৃতীয় রাত্রে শাশুড়ি তাকে যখন স্বামীর ঘরে শুতে বললে, বিন্দুর প্রাণ শুকিয়ে গেল। শাশুড়ি তার প্রচণ্ড, রাগলে জ্ঞান থাকে না । সেও পাগল, কিন্তু পুরো নয় বলেই আরও ভয়ানক । বিন্দুকে ঘরে ঢুকতে হল। স্বামী সে-রাত্রে ঠাণ্ডা ছিল। কিন্তু, ভয়ে বিন্দুর শরীর যেন কাঠ হয়ে গেল। স্বামী যখন ঘুমিয়েছে অনেক রাত্রে সে অনেক কৌশলে পালিয়ে চলে এসেছে, তার বিস্তারিত বিবরণ লেখবার দরকার নেই। ঘৃণায় রাগে আমার সকল শরীর জলতে লাগল। আমি বললুম, “এমন ফকির বিয়ে বিয়েই নয়। বিন্দু, তুই যেমন ছিলি তেমনি আমার কাছে থাক, দেখি তোকে কে নিয়ে যেতে পারে।” তোমরা বললে, “বিন্দু মিথ্যা কথা বলছে।” আমি বললুম, “ও কখনো মিথ্যা বলে নি ।” তোমরা বললে, “কেমন করে জানলে ।” আমি বললুম, “আমি নিশ্চয় জানি।” তোমরা ভয় দেখালে, “বিন্দুর শ্বশুরবাড়ির লোকে পুলিশ-কেস করলে মুশকিলে পড়তে হবে ।” আমি বললুম, “ফাকি দিয়ে পাগল বরের সঙ্গে ওর বিয়ে দিয়েছে এ-কথা কি আদালত শুনবে না ।*