পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ত্রয়োবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৭৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


২৬৮ রবীন্দ্র-রচনাবলী কিন্তু সততার খ্যাতি রক্ষণ হয় না । গচ্ছিত টাকার স্বদ জোগাইতে লাগিলাম, কিন্তু সেটা মুনফগ হইতে নয়। কাজেই স্বদের হার বাড়াইয়া গচ্ছিতের পরিমাণ বাড়াইতে থাকিলাম । আমার বিবাহ অনেকদিন হইয়াছে । আমি জানিতাম, ঘরকন্না ছাড়া আমার স্ত্রীর আর কোনো-কিছুতেই খেয়াল নাই। হঠাৎ দেখি, অগস্ত্যের মতো এক গণ্ডষে টাকার সমুদ্র শুষিয়া লইবার লোভ তারও আছে। আমি জানি না কখন আমারই মনের মধ্য হইতে এই হাওয়াটা আমাদের সমস্ত পরিবারে বহিতে আরম্ভ করিয়াছে । আমাদের চাকর দাসী দরোয়ান পর্যন্ত আমাদের কারবারে টাকা ফেলিতেছে । আমার স্ত্রীও আমাকে ধরিয়া পড়িল, সে কিছু কিছু গহনা বেচিয়া আমার কারবারে টাকা খাটাইবে । আমি ভংগনা করিলাম, উপদেশ দিলাম। বলিলাম, লোভের মতো রিপু নাই –স্ত্রীর টাকা লই নাই । আরও একজনের টাকা আমি লইতে পারি নাই । অতু একটি ছেলে লইয়া বিধবা হইয়াছে। যেমন কৃপণ তেমনি ধনী বলিয়া তার স্বামীর খ্যাতি ছিল । কেহ বলিত, দেড় লক্ষ টাকা তার জমা আছে ; কেহ বলিত আর ও অনেক বেশি। লোকে বলিত, কৃপণতায় অমু তার স্বামীর সহধর্মিণী । আমি ভাবিতাম, তা হবেই তো । অস্তু তো তেমন শিক্ষণ এবং সঙ্গ পায় নাই । এই টাকা কিছু খাটাইয়া দিবার জন্য সে আমাকে অনুরোধ করিয়া পাঠাইয়াছিল। লোভ হইল, দরকারও খুব ছিল, কিন্তু ভয়ে তার সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করিতে গেলাম না । একবার যখন একটা বড়ো হুণ্ডির মেয়াদ আসন্ন এমন সময়ে প্রসন্ন আসিয়া বলিল, “অখিলবাবুর মেয়ের টাকাটা এবার না লইলে নয়।” আমি বলিলাম, "যেরকম দশা সিদ্ধ-কাটাও আমার দ্বারা সম্ভব, কিন্তু ও টাকাটা লইতে পারিব না।” প্রসন্ন কহিল, “যখন হইতে তোমার ভরসা গেছে তখন হইতেই কারবারে লোকসান চলিতেছে! কপাল ঠুকিয় লাগিলেই কপালের জোরও বাড়ে।” কিছুতেই রাজি হইলাম না। পরদিন প্রসন্ন আসিয়া কহিল, "দক্ষিণ হইতে এক বিখ্যাত মারাঠি গণৎকার আসিয়াছে, তাহার কাছে কুঠি লইয়া চলো ।” সনাতন দত্তর বংশে কুষ্টি মিলাইয়া ভাগ্যপরীক্ষা ! দুর্বলতার দিনে মানবপ্রকৃতির ভিতরকার সাবেককেলে বর্বরটা বল পাইয় উঠে। যাহা দৃষ্ট তাহা যখন ভয়ংকর তখন