পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ত্রয়োবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৮৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


২৭২ রবীন্দ্র-রচনাবলী বাক্সের মধ্যে গহনা ছিল, সেগুলি দেখাইয়া সে বলিল, “স্ববোধ যদি বঁাচে ও বিবাহ করে, তবে বউমাকে এই গহনা ও আমার আশীৰ্বাদ দিয়ে । আর এই পান্নার কষ্ঠাটি বউদিদিকে দিয়া বলিয়ে, আমার মাথার দিব্য, তিনি যেন গ্রহণ করেন।” এই বলিয়া অমু যখন ভূমিষ্ঠ হইয়া আমাকে প্রণাম করিল তার দুই চোখ জলে ভরিয়া উঠিল। উঠিয়া দাড়াইয়া তাড়াতাড়ি সে মুখ ফিরাইয়া চলিয়া গেল। এই আমি তার শেষ প্রণাম পাইয়াছি। ইহার দুই দিন পরেই সন্ধ্যার সময় হঠাৎ নিশ্বাস বন্ধ হইয়া তার মৃত্যু হইল— আমাকে খবর দিবার সময় পাইল না। ভাইফোটার নিমন্ত্রণ সারিয়া, টিনের বাক্স হাতে, গাড়ি হইতে বাড়ির দরজায় যেমীন নামিলাম দেখি, প্রসন্ন অপেক্ষা করিয়া অেেছ । জিজ্ঞাসা করিল, "দাদা, খবর ভালো তো ?” আমি বলিলাম, “এ টাকায় কেহ হাত দিতে পারিবে না ।” প্রসন্ন কহিল, "কিন্তু—” আমি বলিলাম, “সে জানি না— যা হয় তা হোক, এ টাকা আমার ব্যবসায়ে লাগিবে ন; /* প্রসন্ন বলিল, “তবে তোমার অস্ত্যেষ্টিসৎকারে লাগিবে ।” অনুর মৃত্যুর পর স্ববোধ আমার বাড়িতে আসিয়া আমার ছেলে নিত্যধনকে সঙ্গী পাইল । যারা গল্পের বই পড়ে মনে করে, মানুষের মনের বড়ো বড়ো পরিবর্তন ধীরে ধীরে ঘটে। ঠিক উলটা। টিকার আগুন ধরিতে সময় লাগে কিন্তু বড়ো বড়ে আগুন হুহু করিয়া ধরে । আমি একথা যদি বলি যে, অতি অল্প সময়ের মধ্যে স্ববোধের উপর অামার মনের একটা বিদ্বেষ দেখিতে দেখিতে বাড়িয়া উঠিল, তবে সবাই তার বিস্তারিত কৈফিয়ত চাহিবে । স্ববোধ অনাথ, সে বড়ো ক্ষীণপ্রাণ, সে দেখিতেও সুন্দর, সকলের উপরে স্থবোধের মা স্বয়ং অনু— কিন্তু তার কথাবাত চলাফের, খেলাধুলা, সমস্তই যেন আমাকে দিনরাত খোচা দিতে লাগিল । আসল, সময়টা বড়ো খারাপ পড়িয়াছিল । স্থবোধের টাকা কিছুতেই লইব না পণ ছিল, অথচ ও টাকাটা না লইলে নয় এমনি অবস্থা । শেষকালে একদিন মহা বিপদে পড়িয়া কিছু লইলাম। ইহাতে আমার মনের কল এমনি বিগড়াইয়া গেল যে, স্ববোধের কাছে মুখ-দেখানো আমার দায় হইল। প্রথমটা উহাকে এড়াইতে থাকিলাম, তার পর উহার উপরে বিষম রাগিতে আরম্ভ করিলাম। রাগিবার প্রথম উপলক্ষ্য হইল উহার স্বভাব। আমি নিজে ব্যস্তবাগীশ, সব কাজ