পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ত্রয়োবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৮৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ 《: চায় না, নড়িতে-চড়িতে তার সাত দিন লাগে। এক-একদিন দেখি, বিকালে পাচটার সময়ে ও সে বিছানায় গড়াইতেছে — সকালে তাকে বিছানা হইতে জোর করিয়া উঠাইয়া দিতে হয়— চলিবার সময় যেন পায়ে পায়ে জড়াইয়া চলে। আমি স্ববোধকে বলিতাম, জন্মকুঁড়ে, কুঁড়েমির মহামহোপাধ্যায়। সে লজ্জিত হইয়া চুপ করিয়া থাকিত । একদিন তাকে বলিয়াছিলাম, "বল দেখি প্রশান্ত মহাসাগরের পরে কোন মহাসাগর।” যখন সে জবাব দিতে পারিল না আমি বলিলাম, “সে ইচ্ছ তুমি, আলস্তমহাসাগর।” পারংপক্ষে স্ববোধ কোনো দিন আমার কাছে কাদে না, কিন্তু সেদিন তার চোখ দিয়া ঝরঝর করিয়া জল পড়িতে লাগিল। সে মার গালি সব সহিতে পারিত, কিন্তু বিদ্ধপ তার মর্মে গিয়া বাজিত । বেলা গেল । রাত হইল। ঘরে কেহ বাতি দিল না। আমি ডাকাডাকি করিলাম, কেহ সাড়া দিল না। বাড়িমৃদ্ধ সকলের উপর আমার রাগ হইল। তার পরে হঠাৎ আমার সন্দেহ হইল, হয়তো প্রসন্ন স্বদের টাকা স্থবোধের হাতে দিয়াছে, স্ববোধ তাই লইয়া পালাইয়াছে। অামার ঘরে স্থবোধের যে আরাম ছিল না সে আমি জানিতাম । ছেলেবেলা হইতে আরাম জিনিসটাকে অন্যায় বলিয়াই জানি, বিশেষত ছোটো ছেলের পক্ষে । তাই এ সম্বন্ধে আমার মনে কোনো পরিতাপ ছিল না। কিন্তু তাই বলিয়া সুবোধ যে টাকা লইয়া পালাইয়া যাইতে পারে ইহা চিস্তা করিয়া আমি তাকে কপট অকৃতজ্ঞ বলিয়া মনে মনে গালি দিতে লাগিলাম । এই বয়সেই চুরি আরম্ভ করিল, ইহাস গতি কী হইবে । আমার কাছে থাকিয়া, আমাদের বাড়িতে বাস করিয়াও ইহার এমন শিক্ষা হইল কী করিয়া। স্থবোধ যে টাকা চুরি করিয়া পালাইয়াছে এ-সম্বন্ধে আমার মনে কোনো সন্দেহ রহিল না । ইচ্ছা হইল, পশ্চাতে ছুটিয়া তাকে যেখানে পাই ধরিয়া আনি, এবং আপাদমস্তক একবার কষিয়া প্রহার করি । এমন সময়ে আমার অন্ধকার ঘরে সুবোধ আসিয়া প্রবেশ করিল। তখন আমার এমন রাগ হইয়াছে যে চেষ্টা করিয়াও আমার কণ্ঠ দিয়া কথা বাহির হইল না। সুবোধ বলিল, “টাকা পাই নাই।” আমি তো স্থবোধকে টাকা অানিতে বলি নাই, তবে সে কেন বলিল ‘টাকা পাই নাই’। নিশ্চয় টাকা পাইয়া চুরি করিয়াছে— কোথাও লুকাইয়াছে। এই-সমস্ত ভালোমানুষ ছেলেরাই মিটমিটে সয়তান । আমি বস্থ কষ্টে কণ্ঠ পরিষ্কার করিয়া বলিলাম, “টাকা বাহির করিয়া দে।” সেও উদ্ধত হইয়া বলিল, “না, দিব না, তুমি কী করিতে পার করে।” আমি আর কিছুতেই আপনাকে সামলাইতে পারিলাম না। হাতের কাছে লাঠি