পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ত্রয়োবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৮৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


&ግ∞ রবীন্দ্র-রচনাবলী ছিল, সজোরে তার মাথা লক্ষ্য করিয়া মারিলাম। সে আছাড় খাইয়া পড়িয়া গেল । তখন আমার ভয় হইল । নাম ধরিয়া ডাকিলাম, সে সাড়া দিল না। কাছে গিয়া যে দেখিব আমার সে শক্তি রহিল না। কোনো মতেই উঠিতে পারিলাম না । হাংড়াইতে গিয়া দেখি, জাজিম ভিজিয়া গেছে। এ যে রক্ত ! ক্রমে রক্ত ব্যাপ্ত হইতে লাগিল । ক্রমে আমি যেখানে ছিলাম তার চারি দিক রক্তে ভিজিয়া উঠিল । আমার খোলা জানলার বাহির হইতে সন্ধ্যাতারা দেখা যাইতেছিল ; আমি তাড়াতাড়ি চোখ ফিরাইয়া লইলাম— আমার হঠাৎ কেমন মনে হইল, সন্ধ্যাতারাটি ভাইফোটার সেই চন্দনের ফোট। সুবোধের উপর আমার এতদিনকার যে অন্যায় বিদ্বেষ ছিল সে কোথায় এক মুহূর্তে ছিন্ন হইয়া গেল। সে যে অমুর হৃদয়ের ধন ; মায়ের কোল হইতে ভ্ৰষ্ট হইয়া সে যে আমার হৃদয়ে পথ খুজিতে আসিয়াছিল। আমি এ কী করিলাম ! এ কী করিলাম ! ভগবান আমাকে এ কী বুদ্ধি দিলে! আমার টাকার কী দরকার ছিল । আমার সমস্ত কারবার ভাসাইয়া দিয়া সংসারে কেবল এই রুগ্ন বালকটির কাছে যদি ধর্ম রাখিতাম তাহা হইলে যে আমি রক্ষা পাইতাম । ক্রমে ভয় হইতে লাগিল পাছে কেহ আসিয়া পড়ে, পাছে ধরা পড়ি । প্রাণপণে ইচ্ছা করিতে লাগিলাম কেহ যেন না আসে, আলো যেন না আনে—এই অন্ধকার যেন মুহূর্তের জন্য না ঘোচে, যেন কাল স্বৰ্ষ না ওঠে, যেন বিশ্বসংসার একেবারে সম্পূর্ণ মিথ্যা হইয়া এমনিতরো নিবিড় কালো হইয়া আমাকে আর এই ছেলেটিকে চিরদিন ঢাকিয়া রাখে । পায়ের শব্দ শুনিলাম। মনে হইল, কেমন করিয়া পুলিস খবর পাইয়াছে। কী মিথ্যা কৈফিয়ত দিব তাড়াতাড়ি সেইটে ভাবিয়া লইতে চেষ্টা করিলাম, কিন্তু মন একেবারেই ভাবিতে পারিল না । ধড়াস করিয়া দরজাটা পড়িল, ঘরে কে প্রবেশ করিল। আমি আপাদমস্তক চমকিয়া উঠিলাম। দেখিলাম, তখনো রৌদ্র আছে। ঘুমাইয়া পড়িয়াছিলাম ; স্থবোধ ঘরে ঢুকিতেই আমার ঘুম ভাঙিয়াছে। সুবোধ হাটখোলা বড়োবাজার বেলেঘাটা প্রভৃতি যেখানে যেখানে প্রসন্নর দেখা পাইবার সম্ভাবনা ছিল সমস্ত দিন ধরিয়া সব জায়গায় খুজিয়াছে। যে করিয়াই হউক তাহাকে যে আনিতে পারে নাই, এই অপরাধের ভয়ে তার भूथ ब्रॉन श्हेब्र গিয়াছিল। এতদিন পরে দেখিলাম, কী স্বনার তার মুখখানি, কী করুণায় ভরা তার দুইটি চোখ ! আমি বলিলাম, “আয়, বাবা স্থবোধ, আয় আমার কোলে আয় ।”