পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ত্রয়োবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৮৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ ২৭৭ সে আমার কথা বুঝিতেই পারিল না ; ভাবিল, আমি বিদ্রুপ করিতেছি। ফ্যালফ্যাল করিয়া আমার মুখের দিকে তাকাইয়া রহিল এবং খানিকক্ষণ দাড়াইয়াই মূৰ্ছিত হইয়া পড়িয়া গেল । মুহূর্তে আমার বাতের পঙ্গুতা কোথায় চলিয়া গেল। আমি ছুটিয়া গিয়া কোলে করিয়া তাহাকে বিছানায় আনিয়া ফেলিলাম। কুঁজায় জল ছিল, তার মুখে মাথায় ছিটা দিয়া কিছুতেই তার চৈতন্য হইল না । ডাক্তার ডাকিতে পাঠাইলাম । ডাক্তার অালিয়া তার অবস্থা দেখিয়া বিস্মিত হইলেন । বলিলেন, “এ যে একেবারে ক্লাস্তির চরম সীমায় আসিয়াছে। কী করিয়া এমন হওয়া সম্ভব হইল।” আমি বলিলাম, “আজ কোনো কারণে সমস্ত দিন উহাকে পরিশ্রম করিতে হইয়াছে।” তিনি বলিলেন, “এ তো একদিনের কাজ নয়। বোধ হয় দীর্ঘকাল ধরিয়া ইহার ক্ষয় চলিতেছিল, কেহ লক্ষ্য করে নাই ।” উত্তেজক ঔষধ ও পথ্য দিয়া ডাক্তার তার চৈতন্তসাধন করিয়া চলিয়া গেলেন । বলিলেন, “বহু যত্বে যদি দৈবাং বাচিয়া যায় তো বাচিবে, কিন্তু ইহার শরীরে প্রাণশক্তি নিঃশেষ হইয়া গেছে । ৰোধ করি শেষ-কয়েকদিন এ ছেলে কেবলমাত্র মনের জোরে চলাফেরা করিয়াছে।” আমি আমার রোগ ভুলিয়া গেলাম। স্থবোধকে আমার বিছানায় শোয়াইয়া দিনরাত তার সেবা করিতে লাগিলাম। ডাক্তারের যে ফি দিব এমন টাকা আমার ঘরে নাই । স্ত্রীর গহনার বাক্স খুলিলাম। সেই পারার কষ্ঠাটি তুলিয়া লইয়া স্ত্রীকে দিয়া বলিলাম, “এইটি তুমি রাখো ।” বাকি সবগুলি লইয়া বন্ধক দিয়া টাকা লইয়া আসিলাম । কিন্তু টাকায় তো মানুষ বঁাচে না । উহার প্রাণ যে আমি এতদিন ধরিয়া দলিয়া নিঃশেষ করিয়া দিয়াছি । যে স্নেহের অন্ন হইতে উহাকে দিনের পর দিন বঞ্চিত করিয়া রাখিয়াছি আজ যখন তাহা হৃদয় ভরিয়া তাহাকে আনিয়া দিলাম তখন সে আর তাহা গ্রহণ করিতে পারিল না। শূন্ত হাতে তার মার কাছে সে ফিরিয়া গেল। ভাদ্র, ১৩২১