পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ত্রয়োবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩৩২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ లి: কাচা থাকতে থাকতেই ভেঙে ভেঙে পড়ছে, তার কাছে ঘরকন্নার নড়াচড়া এবং রান্নাঘরের চুলোর আগুন কি চোখে পড়ে। ভবানীর ভ্ৰকুটিভঙ্গী ভবই জানেন, এমন কথা কাব্যে পড়েছি। কিন্তু ভবের তিন চক্ষু ; আমার একজোড়া মাত্র, তারও দৃষ্টিশক্তি বই পড়ে পড়ে ক্ষীণ হয়ে গেছে । সুতরাং অসময়ে ভোজের আয়োজন করতে বললে আমার স্ত্রীর ভ্রচাপে কিরকম চাপল্য উপস্থিত হত, তা আমার নজরে পড়ত না। ক্রমে তিনি বুঝে নিয়েছিলেন, অামার ঘরে অসময়ই সময় এবং অনিয়মই নিয়ম । আমার সংসারের ঘড়ি তালকানা এবং আমার গৃহস্থালির কোটরে কোটরে উনপঞ্চাশ পবনের বাস। আমার যাকিছু অর্থ সামর্থ্য তার একটিমাত্র খোলা ড্রেন ছিল, সে হচ্ছে বই-কেনার দিকে ; সংসারের অন্য প্রয়োজন হাংলা কুকুরের মতো এই আমার শখের বিলিতি কুকুরের উচ্ছিষ্ট চেটে ও শুকে কেমন করে যে বেঁচে ছিল, তার রহস্য আমার চেয়ে আমার স্ত্রী বেশি জানতেন । নানা জ্ঞানের বিষয়ে কথা কওয়া আমার মতো লোকের পক্ষে নিতাস্ত দরকার। বিদ্যা জাহির করবার জন্তে নয়, পরের উপকার করবার জন্যেও নয় ; ওটা হচ্ছে কথা কয়ে কয়ে চিস্তা করা, জ্ঞান হজম করবার একটা ব্যয়ামপ্রণালী । আমি যদি লেখক হুতুম, কিম্বা অধ্যাপক হতুম, তা হলে বকুনি আমার পক্ষে বাহুল্য হত। যাদের বাধা খাটুনি আছে খাওয়া হজম করবার জন্যে তাদের উপায় খুজতে হয় না— ধারা ঘরে বলে খায় তাদের অন্তত ছাতের উপর হনহন করে পায়চারি করা দরকার। আমার সেই দশা । তাই যখন আমার দ্বৈতদলটি জমে নি— তখন আমার একমাত্র দ্বৈত ছিলেন আমার স্ত্রী । তিনি আমার এই মানসিক পরিপাকের সশস্ব প্রক্রিয়া দীর্ঘকাল নিঃশব্দে বহন করেছেন । যদিচ তিনি পরতেন মিলের শাড়ি এবং তার গয়নার সোনা খাটি এবং নিরেট ছিল না, কিন্তু স্বামীর কাছ থেকে ষে আলাপ শুনতেন— সৌজাত্যবিদ্যাই ( Eugenics ) বল, মেণ্ডেল-তত্ত্বই বল, আর গাণিতিক যুক্তিশাস্ত্রই বল, তার মধ্যে সস্তা কিম্বা ভেজাল-দেওয়া কিছুই ছিল না। আমার দলবুদ্ধির পর হতে এই অtলাপ থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছিলেন, কিন্তু সেজন্তে তার কোনো নালিশ কোনোদিন শুনি নি । জামার স্ত্রীর নাম আনিলা। ঐ শব্দটার মানে কী তা আমি জানি নে, আমার শ্বশুরও যে জানতেন তা নয়। শব্দটা শুনতে মিষ্ট এবং হঠাৎ মনে হয়, ওর একটকোনো মানে আছে। অভিধানে যাই বলুক, নামটার আসল মানে— আমার স্ত্রী র্তার বাপের আদরের মেয়ে । আমার শাশুড়ি যখন আড়াই বছরের একটি ছেলে রেখে মারা ধান তখন সেই ছোটো ছেলেকে যত্ন করবার মনোরম উপায়স্বরূপে আমার