পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ত্রয়োবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩৪২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ "లల్సి ঘটলে সে সম্বন্ধে কিরকম বিশেষ ব্যবস্থা করতে হয়, কোনোদিন আমি তার কিছুই ভেবে পাই নে। বুকের ভিতরটা হা-হা করতে লাগল। হঠাৎ পয়লা-নম্বরের দিকে তাকিয়ে দেখি, সে বাড়ির দরজা জানলা বন্ধ । দেউড়ির কাছে দরোয়ানজি গড়গড়ায় তামাক টানছে । রাজাবাবু ভোররাত্রে চলে গেছেন। মনটার মধ্যে ছ্যাক্ করে উঠল। হঠাৎ বুঝতে পারলুম, আমি যখন একমনে নব্যতম ন্যায়ের আলোচনা করছিলুম তখন মানবসমাজের পুরাতনতম একটি অন্যায় আমার ঘরে জাল বিস্তার করছিল। ফ্লোবেয়ার, টলস্টয়, টুর্গেনিভ প্রভৃতি বড়ো বড়ো গল্পলিথিয়েদের বইয়ে যখন এইরকমের ঘটনার কথা পড়েছি তখন বড়ো আনন্দে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ক’রে তার তত্ত্বকথা বিশ্লেষণ করে দেখেছি। কিন্তু, নিজের ঘরেই যে এটা এমন স্বনিশ্চিত করে ঘটতে পারে, তা কোনোদিন স্বপ্নেও কল্পনা করি নি । প্রথম ধাক্কাটাকে সামলে নিয়ে আমি প্রবীণ তত্ত্বজ্ঞানীর মতো সমস্ত ব্যাপারটাকে যথোচিত হালকা করে দেখবার চেষ্টা করলুম। যেদিন আমার বিবাহ হয়েছিল সেইদিনকার কথাটা মনে করে শুষ্ক হালি হাসলুম। মনে করলুম, মানুষ কত আকাঙ্ক্ষা, কত আয়োজন, কত আবেগের অপব্যয় করে থাকে। কত দিন, কত রাত্রি, কত বৎসর নিশ্চিন্ত মনে কেটে গেল ; স্ত্রী বলে একটা সজীব পদার্থ নিশ্চয় আছে ব’লে চোখ বুজে ছিলুম ; এমন সময় আজ হঠাৎ চোখ খুলে দেখি, বুদবুদ ফেটে গিয়েছে। গেছে ধাক্‌ গে– কিন্তু জগতে সবই ত বুদবুদ নয়। যুগযুগান্তরের জন্মমৃত্যুকে অতিক্রম করে টিকে রয়েছে এমন-সব জিনিসকে আমি কি চিনতে শিখি নি । কিন্তু দেখলুম, হঠাৎ এই আঘাতে আমার মধ্যে নব্যকালের জ্ঞানীটা মূছিত হয়ে পড়ল, আর কোন আদিকালের প্রাণীটা জেগে উঠে ক্ষুধায় কেঁদে ৰেড়াতে লাগল। বারান্দায় ছাতে পায়চারি করতে করতে, শূন্ত বাড়িতে ঘুরতে ঘুরতে, শেষকালে, যেখানে জানালার কাছে কতদিন আমার স্ত্রীকে একলা চুপ করে বসে থাকতে দেখেছি, একদিন আমার সেই শোবার ঘরে গিয়ে পাগলের মতো সমস্ত জিনিসপত্র ঘাটতে লাগলুম। অনিলের চুল বাধবার আয়নার দেরাজট। হঠাৎ টেনে খুলতেই রেশমের লাল ফিতেয় বাধা একতাড়া চিঠি বেরিয়ে পড়ল। চিঠিগুলি পয়ল-নম্বর থেকে এসেছে। বুকটা জলে উঠল। একবার মনে হল, সবগুলো পুড়িয়ে ফেলি। কিন্তু, যেখানে বড়ো বেদনা সেইখানেই ভয়ংকর টান । এ চিঠিগুলো সমস্ত না পড়ে আমার থাকবার জো নেই। এই চিঠিগুলি পঞ্চাশবার পড়েছি। প্রথম চিঠিখানা তিন-চার টুকরো করে ছেড়া। মনে হল, পাঠিক পড়েই সেটি ছিড়ে ফেলে তার পরে আবার যত্ন করে একখানা কাগজের উপরে গদ দিয়ে জুড়ে রেখেছে। সে চিঠিখানা এই—