পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ত্রয়োবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩৭৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


৩৬২ রবীন্দ্র-রচনাবলী কোথায় আছে এবং কোথায় নাই। অতএব, র্যাহারা অবাস্তব-সাহিত্য সম্বন্ধে দেশকে সতর্ক করিয়া দিতেছেন, তাহারা নাবালক ও নালায়েক পাঠকদের জন্য কোর্ট অফ ওয়ার্ডস খুলিবার কাজ করিতেছেন । কিন্তু, সমালোচক যত বড়ো বিচক্ষণ হোন-না কেন চিরকালই তাহারা পাঠকদের কোলে তুলিয়। সামলাইবেন সেটা তো ধাত্রী এবং ধৃত কাহারও পক্ষে ভালো নয়। পাঠকদিগকে স্পষ্ট করিয়া সমজাইয়া দেওয়া উচিত কোনটা বস্ত এবং কোনটা বস্তু নয় । মুশকিল এই যে, বস্তু একটা নহে এবং সব জায়গায় আমরা একই বস্তুর তত্ত্ব করি না। মানুষের বহুধা প্রকৃতি, তাহার আয়োজন নানা এবং বিচিত্র বস্তুর সন্ধানে তাহাকে ফিরিতে হয় । এখন কথা এই, সাহিত্যের মধ্যে কোন বস্তুকে আমরা খুজি । ওস্তাদের বলিয়া থাকেন, সেটা রসবস্তু । বলা বাহুল্য, এখানে রসসাহিত্যের কথাই হইতেছে। এই রসটা এমন জিনিস যাহার বাস্তবতা সম্বন্ধে তর্ক উঠিলে হাতাহাতি পর্যন্ত গড়ায় এবং এক পক্ষ অথবা উভয় পক্ষ ভূমিসাৎ হইলেও কোনো মীমাংসা হয় না। রস জিনিসটা রসিকের অপেক্ষা রাখে, কেবলমাত্র নিজের জোরে নিজেকে সে সপ্রমাণ করিতে পারে না। সংসারে বিদ্বান, বুদ্ধিমান, দেশহিতৈষী, লোকহিতৈষী প্রভৃতি নানা প্রকারের ভালো ভালো লোক আছেন, কিন্তু দময়ন্তী যেমন সকল দেবতাকে ছাড়িয়া নলের গলায় মালা দিয়াছিলেন, তেমনি রসভারতী স্বয়ম্বরসভায় আর-সকলকেই বাদ দিয়া কেবল রলিকের সন্ধান করিয়া থাকেন। সমালোচক বুক ফুলাইয়া তাল ঠুকিয়া বলেন, ‘আমিই সেই বুলিক। প্রতিবাদ করিতে সাহস হয় না, কিন্তু আরসিক আপনাকে অরলিক বলিয়া জানিয়াছে, সংসারে এই অভিজ্ঞতাটা দেখা যায় না। আমার কোনটা ভালো লাগিল এবং আমার কোনটা ভালো লাগিল না সেইটেই যে রসপরীক্ষার চূড়ান্ত মীমাংস, পনেরো-আনা লোক সে সম্বন্ধে নিঃসংশয় । এইজন্তই সাহিত্যসমালোচনায় বিনয় নাই। মূলধন না থাকিলেও দালালির কাজে নামিতে কাহারও বাধে না, তেমনি সাহিত্যসমালোচনায় কোনো প্রকার পুজির জন্য কেহ সৰুর করে না। কেননা, সমালোচকের পদটা সম্পূর্ণ নিরাপদ । সাহিত্যের যাচাই-ব্যাপারটা এতই যদি অনিশ্চিত, তবে সাহিত্য যাহারা রচনা করে তাহাদের উপায় কী। আশু উপায় দেখি না। অর্থাৎ, তাহারা যদি নিশ্চিত ফল জানিতে চায় তবে সেই জানিবার বরাত তাহাজের প্রপৌত্রের উপর দিতে হয়। নগদ-বিদায় ঘেটা তাহাদের ভাগ্যে জোটে সেটার উপর অত্যন্ত ভয় দেওয়া চলিবে না।