পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ত্রয়োবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪০৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রবীন্দ্র-রচনাবলী 8פכס\ দামকে আমরা দাম ব'লেই মানি নে—সে দাম সেখানে টুকরো টুকরো হয়ে ছিড়ে যায়। বৈষয়িক মূল্য সেখানে পরিহাসের দ্বারা অপমানিত। নিত্যলোকে রসলোকে তথ্যবন্ধন থেকে মানুষের এই-ষে মুক্তি এ কি কম মুক্তি। এই মুক্তির কথা আপনাকে আপনি স্বরণ করিয়ে দেবার জন্তে মানুষ গান গেয়েছে, ছবি একেছে; আপন সত্য ঐশ্বৰ্ষকে হাটবাজার থেকে বঁচিয়ে এনে স্বন্দরের নিত্য ভাণ্ডারে সাজিয়ে রেখেছে ; ভার নিকড়িয়। ধনকে নিকড়িয়া বাশির মুরে গেঁথে রেখেছে। আপনাকে আপনি বারবার বলেছে, ঐ আনন্দলোকেই তোমার সত্য প্রকাশ ।” 蠟 আমি কী বোঝাব তোমাদের কাকে বলে সাহিত্য, কাকে বলে চিত্রকলা । বিশ্লেষণ ক’রে কি এর মর্মে গিয়ে পৌছতে পারি। কোন আদি উৎস থেকে এর স্রোতের ধারা বাহির হয়েছে এক মুহূর্তে তা বোঝা যায়, যখন সেই স্রোতে মন আপনার গা ভাসিয়ে দেয়। আজ সেই বাশির স্বরে যখন মন ভেসেছিল তখন বুঝেছিলেম, বুঝিয়ে দেবার কথা এর মধ্যে কিছু নেই ; এর মধ্যে ডুব দিলেই সব সহজ হয়ে আগে । নীলাকাশের ইশারা আমাদের প্রতিদিন বলেছে, ‘আনন্দধামের মাঝখানে তোমাদের প্রত্যেকের নিমন্ত্রণ।” এ কথা বলেছে, বসন্তের হাওয়ায় বিরহের মরমিয়া কবি । সকালবেলায় প্রভাতকিরণের দূত এসে ধাক্কা দিল। কী । না, নিমন্ত্রণ আছে। উদাস মধ্যাহ্নে মধুকরগুঞ্জিত বনচ্ছায়া দূত হয়ে এসে ধাক দিল, নিমন্ত্রণ আছে। সন্ধ্যামেৰে অস্তস্বৰ্ষচ্ছটায় সে দূত আবার বললে, নিমন্ত্রণ আছে। এত সাজসজ্জা এই দূতের, এত ফুলের মালা, এত গৌরবের মুকুট । কার জন্তে । আমার জন্তে । আমি রাজা নই, জ্ঞানী নই, গুণী নই— আমি সত্য, তাই আমার জন্তে সমস্ত আকাশের রঙ নীল ক’রে, সমস্ত পৃথিবীর আঁচল হামল ক’রে, সমস্ত নক্ষত্রের অক্ষর উজ্জল ক’রে আহবানের বাণী মুখরিত। এই নিমন্ত্রণের উত্তর দিতে হবে না কি। সে উত্তর ঐ আনন্দধামের বাণীতেই যদি না লিখি তা হলে কি গ্রাহ হবে। মানুষ তাই মধুর করেই বললে, “আমার হৃদয়ের তারে তোমার নিমন্ত্রণ বাজল । রূপে বাজল, ভাবনায় বাজল, কর্মে বাজল ; হে চিরস্বন্দর, আমি স্বীকার ক’রে নিলেম । আমিও তেমনি সুন্দর ক’রে তোমাকে চিঠি পাঠাব, যেমন ক’রে তুমি পাঠালে। যেমন তুমি তোমার অনির্বাণ তারকার প্রদীপ জেলে তোমার দূতের হাতে দিয়েছ, আমাকেও তেমনি করে আলো জালতে হবে যে-আলো নেবে না, মালা গাখতে হবে যে-মালা শুকোতে জানে না। আমি মানুষ, আমার ভিতর যদি অনন্তের শক্তি থাকে তবে সেই শক্তির ঐশ্বৰ্ধ দিয়েই তোমার আমন্ত্রণের উত্তর দেব।” মানুষ এমন কথা সাহস করে বলেছে, এতেই তার সকলের চেয়ে বড়ো গৌরব ।