পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ত্রয়োবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৬৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8¢९ রবীন্দ্র-রচনাবলী ফুলের বাগানের সঙ্গে যোগ সম্পূর্ণ পৃথক জাতের। সবজি খেতের শেষ উদ্বেগু খেতের বাইরে, সে হচ্ছে ভোজ্যসংগ্রহ। ফুলের বাগানের যে-উদ্দেশ্য তাকে এক হিসাবে সাহিত্য বলা যেতে পারে। অর্থাৎ, মন তার সঙ্গে মিলতে চায়— সেখানে গিয়ে বসি, সেখানে বেড়াই, সেখানকার সঙ্গে যোগে মন খুশি হয় । এর থেকে বুঝতে পারি, ভাষার ক্ষেত্রে সাহিত্য শব্দের তাৎপর্ষ কী। তার কাজ হচ্ছে হৃদয়ের যোগ ঘটানো, যেখানে যোগটাই শেষ লক্ষ্য । ব্যাবসাদার গোলাপ-জলের কারখানা করে, শহরের হাটে বিক্রি করতে পাঠায় ফুল । সেখানে ফুলের সৌন্দর্যমহিমা গৌণ, তার বাজারদরের হিসাবটাই মুখ্য । বলা বাহুল্য, এই হিসাবটাতে আগ্রহ থাকতে পারে, কিন্তু রস নেই। ফুলের সঙ্গে অহৈতুক মিলনে এই হিসাবের চিন্তাটা আড়াল তুলে দেয়। গোলাপ-জলের কারখানাটা সাহিত্যের সামগ্রী হল না । হতেও পারে কবির হাতে, কিন্তু মালেকের হাতে নয় । সে অনেক দিনের কথা, বোটে চলেছি পদ্মায় । শরৎকালের সন্ধ্যা ; স্বর্ধ মেঘস্তবকের মধ্যে র্তার শেষ ঐশ্বর্ষের সর্বস্বদান পণ ক’রে সদ্য অস্ত গেছেন । আকাশের নীরবতা অনির্বচনীয় শান্তরলে কানায় কানায় পূর্ণ; ভরা নদীতে কোথাও একটু চাঞ্চল্য নেই ; স্তব্ধ চিঙ্কণ জলের উপর সন্ধ্যাভ্রের নানা বর্ণের দীপ্তিচ্ছায়া মান হয়ে মিলিয়ে আসছে। পশ্চিম দিকের তীরে দিগন্তপ্রসারিত জনশূন্ত বালুচর প্রাচীন যুগাস্তরের অতিকায় সরীস্থপের মতো পড়ে আছে। বোট চলেছে অন্ত পারের প্রাপ্ত বেয়ে, ভাঙন-বরা খাড়া পাড়ির তলা দিয়ে দিয়ে ; পাড়ির গায়ে শত শত গর্তে গাঙশালিকের বাসা ; হঠাৎ একটা বড়ো মাছ জলের তলা থেকে ক্ষণিক কলশৰে লাফ দিয়ে উঠে বঙ্কিম ভঙ্গিতে তখনই তলিয়ে গেল । আমাকে চকিত আভাসে জানিয়ে দিয়ে গেল এই জলধবনিকার অস্তরালে নিঃশব্দ জীবলোকে নৃত্যপর প্রাণের আনন্দের কথা, আর সে যেন নমস্কার নিবেদন করে গেল বিলীয়মান দিনাস্তের কাছে । সেই মুহূর্তেই তপসিমাঝি চাপা আক্ষেপের স্বরে সনিশ্বাসে বলে উঠল, "ওঃ ! মস্ত মাছটা।” মাছটা ধরা পড়েছে আর সেটা তৈরি হচ্ছে রান্নার জন্তে, এই ছবিটাই তার মনে জেগে উঠল ; চার দিকের অন্ত ছবিটা খণ্ডিত হয়ে দূরে গেল স’রে। বলা যেতে পারে, বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে তার সাহিত্য গেল নষ্ট হয়ে । আহারে তার আসক্তি তাকে জাপন জঠরগহবরের কেন্দ্রে টেনে রাখল। আপনাকে না ভুললে মিলন হয় না । মাহুষের নানা চাওয়া আছে, সেই চাওয়ার মধ্যে একটি হচ্ছে খাবার জন্তে এই মাছকে চাওয়া। কিন্তু, তার চেয়ে তার বড়ে চাওয়া, বিশ্বের সঙ্গে সাহিত্য অর্থাৎ সন্মিলন চাওয়া—নদীতীরে সেই স্বৰান্ত-আলোৰে-মহিমাতি নিৰলানকে সমস্ত