পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ত্রয়োবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৯৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8bo२ রবীন্দ্র-রচনাবলী সাহিত্যসম্মিলন যখন আমরা কোনো সত্যৰস্তুকে পাই তাহাকে রক্ষণপালনের জন্য বাহির হইতে উপরোধ বা উপদেশের প্রয়োজন হয় না। কোলের ছেলে মানুষ করিবার জন্য মাতাকে শুরুর মন্ত্র বা স্থতিসংহিতার অনুশাসন গ্রহণ করিতে বলা অনাবশুক । বাঙালি একটি সত্য বস্তু পাইয়াছে, ইহা তাহার সাহিত্য । এই সাহিত্যের প্রতি গভীর মমত্ব স্বতই বাঙালির চিত্তকে অধিকার করিয়াছে। এইরূপ একটি সাধারণ প্রীতির সামগ্ৰী সমগ্র জাতিকে যেরূপ স্বাভাবিক ঐক্য দেয় এমন আর কিছুই না। স্বদেশে বিদেশে আজ যেখানে বাঙালি অাছে সেখানেই বাংলাসাহিত্যকে উপলক্ষ্য করিয়া যে সম্মিলন ঘটিতেছে, তাহার মতো অকৃত্ৰিম আননাকর ব্যাপার আর কী আছে। ভিক্ষণ করিয়া যাহা আমরা পাই তাহা আমাদের আপন নহে, উপার্জন করিয়া যাহা পাই তাহাতেও আমাদের আংশিক অধিকার ; নিজের শক্তিতে যাহা আমরা স্বাক্ট করি, অর্থাৎ যাহাতে আমাদের আত্মপ্রকাশ, তাহার পরেই আমাদের পূর্ণ অধিকার । যে-দেশে আমাদের জন্ম সেই দেশে যদি সর্বত্র আমাদের আত্মা আপন বহুধা শক্তিকে নানা বিভাগে নানারূপে স্বষ্টিকার্ষে প্রয়োগ করিতে পারিত, তবে দেশকে ভালোবাসিবার পরামর্শ এত উচ্চস্বরে এবং এমন নিষ্ফলভাবে দিতে হইত না । দেশে আমরা আত্মপ্রকাশ করি না বলিয়াই দেশকে আমরা অকৃত্ৰিম আনন্দে আপন বলিয়া জানি না। বাংলাসাহিত্য আমাদের স্বষ্টি। এমন-কি, ইহা আমাদের নূতন স্বষ্টি বলিলেও হয় । অর্থাৎ, ইহা আমাদের দেশের পুরাতন সাহিত্যের অম্লবৃত্তি নয়। আমাদের প্রাচীন সাহিত্যের ধারা ষে-খাতে বহিত বর্তমান সাহিত্য সেই খাতে বহে না । আমাদের দেশের অধিকাংশ আচার-বিচার পুরাতনের নিজাব পুনরাবৃত্তি। বর্তমান অবস্থার সঙ্গে তাহার অসংগতির সীমা নাই । এইজন্ত তাহার অধিকাংশই আমাদিগকে পদে পদে পরাভবের দিকে লইয়া যাইতেছে। কেবল আমাদের সাহিত্যই নূতন রূপ লইয়া নূতন প্রাণে নূতন কালের সঙ্গে আপন যোগসাধন করিতে প্রবৃত্ত। এইজন্য বাঙালিকে তাহার সাহিত্যই যথার্থভাবে ভিতরের দিক হইতে মানুষ করিয়া তুলিতেছে। যেখানে তাহার সমাজের আর-সমস্তই স্বাধীন পন্থার বিরোধী, যেখানে তাহার লোকাচার তাহাকে নির্বিচার অভ্যাসের দাসত্বপাশে আচল করিয়া বাধিয়াছে, সেখানে তাহার সাহিত্যই তাহার মনকে মুক্তি দেবার একমাত্র শক্তি। বাহিরে যখন সে জড়পুত্তলীর মতো হাজার বৎসরের দড়ির টানে বাধা কায়দায় চলাফেরা করিতেছে, সেখানে কেবল সাহিত্যেই তাহার মন বেপরোয় হইয়া ভাবিতে পারে ; সেখানে সাহিত্যেই অনেক