পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (ত্রয়োবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৫৩৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


é३९ রবীন্দ্র-রচনাবলী ধার-করা সাজসজ্জার মতোই তাকে অস্থির করে রাখলে, বাইরে থেকে পাওয়া জিনিসের অহংকার নিয়ত উদ্যত হয়ে রইল। ইংরেজিসাহিত্যের ঐশ্বর্বভোগের অধিকার তখন ছিল দুর্লভ এবং অল্পসংখ্যক লোকের আয়ত্তগম্য, সেই কারণেই এই সংকীর্ণশ্রেণীগত ইংরেজি-পোড়োর দল নূতনলৰ শিক্ষাকে অস্বাভাবিক আড়ম্বরের সঙ্গেই ব্যবহার করতেন । কথায়-বার্তায় পত্রব্যবহারে সাহিত্যরচনায় ইংরেজিভাষার বাইরে পা বাড়ানো তখনকার শিক্ষিতদের পক্ষে ছিল আকৌলীন্যের লক্ষণ । বাংলাভাযা তখন সংস্কৃতপণ্ডিত ও বাংলা-পণ্ডিত দুই দলের কাছেই ছিল অপাঙক্তেয়। এ ভাষার দারিত্র্যে তারা লজ্জাবোধ করতেন । এই ভাষাকে তারা এমন একটি অগভীর শীর্ণ নদীর মতো মনে করতেন যার ইটুজলে পাড়াগেয়ে মাহুষের প্রতিদিনের সামান্ত ঘোরো কাজ চলে মাত্র, কিন্তু দেশবিদেশের পণ্যবাহী জাহাজ চলতে পারে না । তবু এ কথা মানতে হবে, এই অহংকারের মূলে ছিল পশ্চিম-মহাদেশ হতে আহরিত নূতন-সাহিত্যরস-সম্ভোগের সহজ শক্তি । সেটা বিস্ময়ের বিষয়, কেননা, তাদের পূর্বতন সংস্কারের সঙ্গে এর সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ ছিল। অনেককাল মনের জমি ঠিকমতো চাষের অভাবে ভরা ছিল আগাছায়, কিন্তু তার অস্তরে অস্তরে সফলতার শক্তি ছিল প্রচ্ছন্ন ; তাই কৃষির সূচনা হবামাত্রই সাড়া দিতে সে দেরি করলে না । পূর্বকালের থেকে তার বর্তমান অবস্থার যে-প্রভেদ দেখা গেল তা দ্রুত এবং বৃহৎ । তার একটা বিস্ময়কর প্রমাণ দেখি রামমোহন রায়ের মধ্যে । সেদিন তিনি যে ংলাভাষায় ব্রহ্মস্থত্রের অম্বুবাদ ও ব্যাখ্যা করতে প্রবৃত্ত হলেন সে-ভাষার পূর্বপরিচয় এমন-কিছুই ছিল না যাতে করে তার উপরে এত বড়ো দুরূহ ভার অর্পণ সহজে সম্ভবপর মনে হতে পারত। বাংলা ভাষায় তখন সাহিত্যিক গদ্য সবে দেখা দিতে আরম্ভ করেছে নদীর তটে সম্ভশায়িত পলিমাটির স্তরের মতো । এই অপরিণত গষ্ঠেই দুর্বোধ তত্ত্বালোচনার ভারবহু ভিত্তি সংঘটন করতে রামমোহন কুষ্ঠিত হলেন না । এই যেমন গদ্যে, পষ্ঠে তেমনি অসম সাহস প্রকাশ করলেন মধুসূদন। পাশ্চাত্য হোমর-মিলটন-রচিত মহাকাব্যসঞ্চারী মন ছিল তার। তার রসে তিনি একান্তভাবে মুগ্ধ হয়েছিলেন বলেই তার ভোগমাত্রেই স্তব্ধ থাকতে পারেন নি। আষাঢ়ের আকাশে সজলনীল মেঘপুঞ্জ থেকে গর্জন নামল, গিরিগুহা থেকে তার অনুকরণে প্রতিধ্বনি উঠল মাত্র, কিন্তু আনন্দচঞ্চল ময়ুর আকাশে মাথা তুলে সাড়া দিলে আপন কেকাধনিতেই। মধুসূদন সংগীতের দুৰ্নিবার উৎসাহ ঘোষণা করবার জন্তে