পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাদশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/১৮৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


১৬৬ রবীন্দ্র-রচনাবলী । “তুমি নেই এখন ওদের গায়ে হাত দেয় কার সাধ্যি ।” “ওই ন! শুনলেম গাড়ির শব্দ ?” “হা, বাবুর গাড়ি এল।” “হাত-আয়নাটা এগিয়ে দে। বড়ে গোলাপটা নিয়ে আয় ফুলদানি থেকে । সেফটিপিনের বাক্সটা কোথায় দেখি। আজ আমার মুখ বড়ো ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। যা তুই ঘর থেকে ।” “যাচ্ছি, কিন্তু দুধ বার্লি পড়ে আছে, খেয়ে নাও লক্ষ্মীটি।” “থাক পড়ে, খাব না।” “দু দাগ ওষুধ তোমার আজ খাওয়া হয় নি।” “তোর বকতে হবে না, তুই যা বলছি, ওই জানলাটা খুলে দিয়ে যা।” অণয়া চলে গেল । ঢং ঢং করে তিনটে বাজল। আরক্ত হয়ে এসেছে রোদ রের রং, ছায়া হেলে পড়েছে পুবদিকে, বাতাস এল দক্ষিণ থেকে, ঝিলের জল উঠল টল টল করে। মালীর লেগেছে কাজে, নীরজা দূর থেকে যতটা পারে তাই দেখে । দ্রুতপদে আদিত্য ছুটে এল ঘরে। হাত জোড়া বাসস্তী রংএর দেশী ল্যাবার্ণাম ফুলের মঞ্জরীতে। তাই দিয়ে ঢেকে দিল নীরজার পায়ের কাছটা। বিছানায় বসেই তার হাত চেপে ধরে বললে, “আজ কতক্ষণ তোমাকে দেখি নি নীরু।” শুনে নীরজা আর থাকতে পারলে না, ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। আদিত্য খাটের থেকে নেমে মেজের উপর হাটু গেড়ে নীরজার গলা জড়িয়ে ধরলে, তার ভিজে গালে চুমে খেয়ে বললে, “মনে মনে তুমি নিশ্চয় জান আমার দোষ ছিল না।” “অত নিশ্চয় করে কী করে জঞ্জনব বলে । অামার কি আর সেদিন আছে ।” “দিনের কথা হিসেব করে কী হবে। তুমি তো আমার সেই তুমিই আছ।” “আজ যে আমার সকলতাতেই ভয় করে । জোর পাই নে যে মনে ।” “অল্প একটু ভয় করতে ভালো লাগে । না ? খোটা দিয়ে আমাকে একটুখানি উসকিয়ে দিতে চাও। এ চাতুরী মেয়েদের স্বভাবসিদ্ধ।” “আর ভুলে-যাওয়া বুঝি পুরুষদের স্বভাবসিদ্ধ নয় ?” “ভুলতে ফুরসৎ দাও কই।” “বোলো না বোলো না, পোড়া বিধাতার শাপে লম্বা ফুরসৎ দিয়েছি যে।” “উলটো বললে । সুখের দিনে ভোলা যায়, ব্যথার দিনে নয়।” “সত্যি বলে, আজ সকালে তুমি ভুলে চলে যাও নি ?"