পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাদশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/১৯৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


মালঞ্চ ১৭৩ উঠল চমকে । এ কী ব্যাপার। বুঝতে পারল এই কান্না অনেকদিনকার। বেদনার ঘূর্ণিবাতাস নীরজার অস্তরে অস্তরে বেগ পেয়ে উঠছিল দিনে দিনে, আদিত্য জানতে পারে নি মুহূর্তের জন্যেও । এমন নির্বোধ যে, মনে করেছিল, সরলা বাগানের যত্ব করতে পারে এতে নীরজা খুশি। বিশেষত ঋতুর হিসাব করে বাছাই-করা ফুলে কেয়ারি সাজাতে ও অদ্বিতীয়। আজ হঠাৎ মনে পড়ল, একদিন যখন কোনে উপলক্ষে সরলার প্রশংসা করে ও বলেছিল, “কামিনীর বেড়া এমন মানানসই ক’রে আমি তো লাগাতে পারতুম না”, তখন তীব্র হেসে বলেছে নীরজ, “ওগো মশায়, উচিত পাওনার চেয়ে বেশি দিলে আখেরে মানুষের লোকসান করাই হয়।” আদিত্যের আজ মনে পড়ল, গাছপালা সম্বন্ধে কোনোমতে সরলার একটা ভুল যদি ধরতে পারত নীরজা উচ্চহাস্তে কথাটাকে ফিরে ফিরে মুখরিত করে তুলত। স্পষ্ট মনে পড়ল, ইংরেজি বই খুজে খুজে নীরজা মুখস্থ করে রাখত অল্পপরিচিত ফুলের উদ্ভট নাম ; ভালোমানুষের মতো জিজ্ঞাসা করত সরলকে, যখন সে ভুল করত, তখন থামতে চাইত না ওর হাসির হিল্লোল ; “ভারি পণ্ডিত, কে না জানে ওর নাম ক্যাসিয়া জাভানিকা । আমার হলা মালীও বলতে পারত।” আদিত্য অনেকক্ষণ ধরে বসে ভাবলে । তার পরে হাত ধরে বললে, “কেঁদো না নীরু, বলে কী করব। তুমি কি চাও সরলাকে বাগানের কাজে না রাখি।” নীরজ হাত ছিনিয়ে নিয়ে বললে, “কিছু চাই নে, কিছু না, ও তো তোমারই বাগান। তুমি যাকে খুশি রাখতে পারো আমার তাতে কী।” “নীরু, এমন কথা তুমি বলতে পারলে, আমারই বাগান ? তোমার নয় ? আমাদের মধ্যে এই ভাগ হয়ে গেল কবে থেকে।” “যবে থেকে তোমার রইল বিশ্বের আর সমস্ত-কিছু আর আমার রইল কেবল এই ঘরের কোণ । আমার এই ভাঙা প্রাণ নিয়ে দাড়াব কিসের জোরে তোমার ওই আশ্চর্য সরলার সামনে । আমার সে শক্তি আজ কোথায় যে তোমার সেবা করি, তোমার বাগানের কাজ করি।” “নীরু, তুমি তো কতদিন এর আগে আপনি সরলাকে ডেকে পাঠিয়েছ, নিয়েছ ওর পরামর্শ। মনে নেই কি এই কয়েক বছর আগে বাতাবিলেবুর সঙ্গে কলম্বালেবুর কলম বেঁধেছ দুইজনে, আমাকে আশ্চর্য করে দেবার জন্যে ।” “তখন তে ওর এত গুমর ছিল না । বিধাতা যে আমারই দিকে আজ অন্ধকার করে দিলে, তাই তো তোমার কাছে হঠাৎ ধরা পড়ছে, ও এত জানে ও তত জানে, অরকিড চিনতে আমি ওর কাছে লাগি নে। সেদিন তো এ-সব কথা