পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাদশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২০৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


মালঞ্চ ՏԵ-(t “বুক ফেটে যায় ঠাকুরপো, বুক ফেটে যায়। আমার এতদিনের আনন্দকে ফেলে রেখে হাসিমুখেই চলে যেতে পারতুম। কিন্তু কোনোখানে কি এতটুকু ফাক থাকবে না যেখানে আমার জন্যে একটা বিরহের দীপ টিমটিম করেও জলবে । এ কথা ভাবতে গেলে যে মরতেও ইচ্ছে করে না। ওই সরল সমস্তটাই দখল করবে একেবারে পুরোপুরি, বিধাতার এই কি বিচার ।” “সত্যি কথা বলব বউদি, রাগ কোরো না । তোমার কথা ভালো বুঝতেই পারি নে। যা নিজে ভোগ করতে পারবে না, তাও প্রসন্ন মনে দান করতে পার না যাকে এতদিন এত দিয়েছ ? তোমার ভালোবাসার উপর এত বড়ো খোট। থেকে যাবে ? তোমার সংসারে তোমারই শ্রদ্ধার প্রদীপ তুমি আপনিই আজ চুরমার করতে বসেছ। তার ব্যথা তুমি চলে যাবে এড়িয়ে, কিন্তু চিরদিন সে আমাদের বাজবে যে । মিনতি করে বলছি, তোমার সারাজীবনের দাক্ষিণ্যকে শেষমূহুর্তে কৃপণ করে যেয়ে না।” ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল নীরজা। চুপ করে বসে রইল রমেন, সান্তন দেবার চেষ্টামাত্র করলে না, কান্নার বেগ থেমে গেলে নীরজ বিছানায় উঠে বসল। বললে, “আমার একটি ভিক্ষা আছে ঠাকুরপো ।” “হুকুম করে বউদি।” “বলি শোনো । যখন চোখের জলে ভিতরে ভিতরে বুক ভেসে যায় তখন ওই পরমহংসদেবের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকি। কিন্তু ওঁর বাণী তো হৃদয়ে পৌছয় না। আমার মন বিশ্ৰী ছোটো । যেমন করে পার আমাকে গুরুর সন্ধান দাও । না হলে কাটবে না বন্ধন । আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ব । যে সংসারে সুখের জীবন কাটিয়েছি, মরার পরে সেইখানেই দুঃখের হাওয়ায় যুগযুগান্তর কেঁদে কেঁদে বেড়াতে হবে ; তার থেকে উদ্ধার করো অামাকে, উদ্ধার করে।” “তুমি তো জান বউদি শাস্ত্রে যাকে বলে পাষণ্ড, আমি তাই। কিছু মানি নে। প্রভাস মিত্তির অনেক টানাটানি করে একবার আমাকে তার গুরুর কাছে নিয়ে গিয়েছিল। বাধা পড়বার আগেই দিলেম দৌড়। জেলখানার মেয়াদ অাছে, এ বাধন বেমেয়াদি ।” “ঠাকুরপো, তোমার মন জোরালো, তুমি কিছুতে বুঝবে না আমার বিপদ । বেশ জানি যতই অঁাকুবাকু করছি ততই ডুবছি অগাধ জলে, সামলাতে পারছি নে ৷” “বউদি, একটা কথা বলি শোনো। যতক্ষণ মনে করবে তোমার ধন কেউ কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে ততক্ষণ বুকের পাজর জলবে আগুনে। পাবে না শাস্তি ।