পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাদশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩৫৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শিক্ষা هارهارها( সঙ্গে আমাদের বিচ্ছেদ ঘটায়। তাহাকে আমরা কিছুতেই ভুলিতে পারি না বলিয়া অহংকার বাড়িয়া উঠে ; সেই অহংকারের যেটুকু স্থখ সেই আমাদের একমাত্র সম্বল। নহিলে জ্ঞানের স্বাভাবিক আনন্দ আমরা যদি লাভ করিতাম তবে এতগুলি শিক্ষিতলোকের মধ্যে অস্তত গুটিকয়েককেও দেখিতে পাইতাম যাহারা জ্ঞানচর্চার জন্য নিজের সমস্ত স্বার্থকে খর্ব করিয়াছেন। কিন্তু দেখিতে পাই, সায়েন্সের পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠালাভ করিয়া ডেপুটিম্যাজিষ্ট্রেট হইয়া সমস্ত বিদ্যা আইন-আদালতের অতলস্পর্শ নিরর্থকতার মধ্যে চিরদিনের মতো বিসর্জন করিতে সকলে ব্যগ্র এবং কতকগুলা পাস করিয়া কেবল হতভাগা কন্যার পিতাকে ঋণের পঙ্কে ডুবাইয়া মারাই র্তাহীদের একমাত্র স্থায়ী কীর্তি হইয় থাকে। দেশে বড়ে বড়ো শিক্ষিত উকিল-জজকেরানীর অভাব নাই, কিন্তু জ্ঞানতপস্বী কোথায় । কথায়-কথায় কথা অনেক বাড়িয়া গেল। উপস্থিতমতো আমার যেটুকু বক্তব্য সে এই– বইপড়াটাই যে শেখা, ছেলেদের মনে এই অন্ধসংস্কার যেন জন্মিতে দেওয়া না হয়। প্রকৃতির অক্ষয়ভাণ্ডার হইতেই যে বইয়ের সঞ্চয় আহরিত হইয়াছে, অন্তত হওয়া উচিত, এবং সেখানে যে আমাদেরও অধিকার অাছে, এ কথা পদে পদে জানানো চাই। বইয়ের দৌরাত্ম্য অত্যন্ত বেশি হইয়াছে বলিয়াই বেশি করিয়া জানানো চাই। এ দেশে অতি পুরাকালে যখন লিপি প্রচলিত ছিল তখনও তপোবনে পুথিব্যবহার হয় নাই। তখনও গুরু শিস্যকে মুখে-মুখেই শিক্ষা দিতেন, এবং ছাত্র তাহা খাতায় নহে, মনের মধ্যেই লিখিয়া লইত । এমনি করিয়া এক দীপশিখা হইতে আর-এক দীপশিখা জ্বলিত। এখন ঠিক এমনটি হইতে পারে না। কিন্তু যথাসম্ভব ছাত্রদিগকে পুথির আক্রমণ হইতে রক্ষা করিতে হইবে। পারতপক্ষে ছাত্রদিগকে পরের রচনা পড়িতে দেওয়া নহে— তাহারা গুরুর কাছে যাহা শিখিবে, তাহীদের নিজেকে দিয়া তাহাই রচনা করিয়া লইতে হইবে ; এই স্বরচিত গ্ৰন্থই তাহীদের গ্রন্থ। এমন হইলে তাহারা মনেও করিবে না, গ্রন্থগুলা আকাশ হইতে পড়া বেদবাক্য । ‘আর্যর মধ্য-এশিয়া হইতে ভারতে আসিয়াছেন, খৃষ্টজন্মের দুই হাজার বৎসর পূর্বে বেদরচনা হইয়াছে’, এই-সকল কথা আমরা বই হইতে পড়িয়াছি— বইয়ের অক্ষরগুলো কাটকুটহীন নির্বিকার ; তাহারা শিশুবয়সে আমাদের উপরে সম্মোহন প্রয়োগ করে— তাই আমাদের কাছে আজ এ-সমস্ত কথা একেবারে দৈববাণীর মতো। ছেলেদের প্রথম হইতেই জানাইতে হইবে, এই-সকল আহমানিক কথা কতকগুলা যুক্তির উপর নির্ভর করিতেছে। সেইসকল যুক্তির মূল উপকরণগুলি যথাসম্ভব তাহদের সম্মুখে ধরিয়া তাহাদের নিজেদের অনুমানশক্তির উদ্রেক করিতে হইবে। বইগুলা যে কী