পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাদশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩৯৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শব্দতত্ত্ব \o۹ ہ ধ্বনির অনুকরণে ধ্বনির বর্ণন। ইংরেজি ভাষাতেও আছে ; যথl, bang thud ding-dong hiss ইত্যাদি। কিন্তু বাংলাভাষার সহিত তুলনায় তাহা যৎসামান্য । পূর্বোদ্ধত তালিকা দেখিলে তাহ প্রমাণ হইবে। কিন্তু বাংলাভাষার একটি অদ্ভুত বিশেষত্ব আছে, তৎপ্রতি পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করিতে ইচ্ছা করি। - যে-সকল অনুভূতি শ্রুতিগ্রাহ নহে, আমরা তাহাকেও ধ্বনিরূপে বর্ণনা করিয়া থাকি । 弹 এরূপ ভিন্নজাতীয় অনুভূতি সম্বন্ধে ভাষাবিপর্যয়ের উদাহরণ কেবল বাংলায় নহে, সর্বত্রই পাওয়া যায়। 'মিষ্ট বিশেষণ শব্দ গোড়ায় স্বাদ সম্বন্ধে ব্যবহৃত হইয়া ক্রমে মিষ্ট মুখ, মিষ্ট কথা, মিষ্ট গন্ধ প্রভৃতি নানা স্বতন্ত্র-জাতীয় ইন্দ্ৰিয়বোধ সম্বন্ধে প্রযুক্ত হইয়াছে। ইংরেজিতে loud শব্দ ধ্বনির বিশেষণ হইলেও বর্ণের বিশেষণরূপে প্রয়োগ হইয়া থাকে, যথা loud colour । কিন্তু এরূপ উদাহরণ বিশ্লেষণ করিলে অধিকাংশ স্থলেই দেখা যাইবুে,এই শব্দগুলির আদিম ব্যবহার যতই সংকীর্ণ থাক, ক্রমেই তাহার অর্থের ব্যাপ্তি হইয়াছে। মিষ্ট শব্দ মুখ্যত স্বাদকে বুঝাইলেও এক্ষণে তাহার গৌণ অর্থ মনোহর দাড়াইয়াছে। কিন্তু আমাদের তালিকাধুত শব্দগুলি সে শ্রেণীর নহে। তাহাদিগকে অর্থবদ্ধ শব্দ বলা অপেক্ষ ধ্বনি বলাই উচিত। সৈন্যদলের পশ্চাতে যেমন একদল আতুযাত্রিক থাকে, তাহারা রীতিমতো সৈন্য নহে অথচ সৈন্যদের নানাবিধ প্রয়োজন সরবরাহ করে, ইহারাও বাংলাভাষার পশ্চাতে সেইরূপ ঝণকে ঝণকে ফিরিয়া সহস্র কর্ম করিয়া থাকে, অথচ রীতিমতো শব্দশ্রেণীতে ভরতি হইয়া অভিধানকারের নিকট সম্মান প্রাপ্ত হয় নাই । ইহারা অত্যস্ত কাজের অথচ অখ্যাত অবজ্ঞাত। ইহার না থাকিলে বাংলাভাষায় বর্ণনার পাঠ একেবারে উঠাইয়া দিতে হয় । পূর্বেই আভাস দিয়াছি, বাংলাভাষায় সকল প্রকার ইন্দ্ৰিয়বোধই অধিকাংশস্থলে শ্রীতিগম্য ধ্বনির আকারে ব্যক্ত হইয়া থাকে । গতির দ্রুততা প্রধানত চক্ষুরিন্দ্রিয়ের বিষয় ; কিন্তু আমরা স্বলি ধা করিয়া, সঁ৷ করিয়া, বো করিয়া অথবা ভো করিয়া চলিয় গেল। তীর প্রভৃতি দ্রুতগামী পদার্থ বাতাসে উক্তরূপ ধ্বনি করে, সেই ধ্বনি আশ্রয় করিয়া বাংলাভাষা চকিতের মধ্যে তীরের উপমা মনে আনয়ন করে। তাঁরবেগে চলিয়া গেল, বলিলে প্রথমে অর্থবোধ ও পরে কল্পনা উদ্রেক হইতে সময় লাগে ; সঁা শব্দের অর্থের বালাই নাই, সেইজন্য কল্পনাকে সে অব্যবহিত ভাবে ঠেলা দিয়া চেতাইয়া তোলে।