পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাদশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৩৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8〉b" كاتsvg রবীন্দ্র-রচনাবলী অতএব উক্ত সর্বজনমান্য প্রবন্ধদ্বয়কে মুখ্যত অবলম্বন করিয়া আমি বর্তমান প্রবন্ধ রচনা করিয়াছি, এবং এই উপলক্ষে আমার মতামত যথাসাথ্য ব্যক্ত করিয়াছি।” চন্দ্রনাথবাবু র্তাহার ‘হিন্দুপত্নী প্রবন্ধে বলিয়াছেন : খ্ৰীষ্টধর্মের আবির্ভাবের বহুপূর্বে ভারতে হিন্দুজাতি স্ত্রীজাতিকে অতি উৎকৃষ্ট ও মাননীয় বলিয়া বুঝিয়াছিল এবং অপর দেশে খ্ৰীষ্টধর্ম স্ত্রীজাতিকে যত উচ্চ করিয়া তুলিয়াছিল ভারতের হিন্দু ভারতের স্ত্রীকে তদপেক্ষ অনেক উচ্চ আসনে বসাইয়াছিল। খ্ৰীষ্টধর্ম স্ত্রীকে পুরুষের সমান করিয়াছিল ; হিন্দুধর্ম স্ত্রীকে পুরুষের সমান করে নাই, পুরুষের দেবতা করিয়াছিল। "যত্র নার্যস্তু পূজ্যন্তে রমস্তে তত্র দেবতাঃ । যেখানে নারী পূজিত হন সেখানে দেবতা সন্তুষ্ট হন। { প্রাচীন কালে স্ত্রীলোকের অবস্থা কিরূপ ছিল তাহা আমি বলিতে পারি না, কারণ আমি সংস্কৃতভাষায় ব্যুৎপন্ন নহি এবং আমার শাস্ত্রজ্ঞান যথেষ্ট পরিমাণে নাই । কিন্তু আজকাল মুখে ও লেখায় ও অনুবাদে শাস্ত্রচর্চা দেশে এতটুকু ব্যাপ্ত হইয়াছে যে, শাস্ত্রসম্বন্ধে কথঞ্চিৎ আলোচনা করিবার অধিকার অনেকেরই জন্মিয়াছে। চন্দ্রনাথবাবুর মত সত্য কি মিথ্যা তাহ৷ সাহস করিয়া বলিতে পারি না, কিন্তু এটুকু বলিতে পারি যে, চন্দ্রনাথবাৰু তাহার মত ভালোরূপ প্রমাণ করিতে পারেন নাই । তিনি যেমন দুই-একটি শ্লোক আপন মতের স্বপক্ষ্যে উদ্ধৃত করিয়াছেন, আমিও তেমনই অনেকগুলি শ্লোক র্তাহার মতের বিপক্ষে উদ্ধৃত করিতে পারি। কিন্তু মনুসংহিতায় স্ত্রীনিন্দাবাচক যে-সকল শ্লোক অাছে তাহ উদ্ধৃত করিতে লজ্জা ও কষ্ট বোধ হয়। র্যাহারা জানিতে চাহেন তাহারা মকুসংহিতার নবম অধ্যায়ে চতুর্দশ পঞ্চদশ ও ষোড়শ শ্লোক পাঠ করিবেন, আমি কেবল সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শ্লোক এইখানে পাঠ করি । ১ এইখানে বলা আবগুক, চন্দ্রনাথবাবু যখন বিবাহ সম্বন্ধে তাহার প্রবন্ধ লিখিয়াছিলেন তখন এ বিষয়ে আন্দোলন কিছুই ছিল না । সুতরাং বিবাহের সমস্ত দিক আলোচনার তেমন আবখ্যক ছিল না। তখন সহৃদয় কল্পনার দ্বারা নীত হইয়া হিন্দুবিবাহের কোনো একরূপ বিশেষ ব্যাখ্যা করা আশ্চর্য নহে ; ইহাতে সাহিত্যের অধিকার আছে। কিন্তু আজকাল বিষয়টি যেরূপ হইয়া দাড়াইয়াছে, তাহাতে ইহাকে কেবল সাহিত্যের হিসাবে দেখিলে আর চলে না। এইজন্ত সাহিত্যের কল্পনাপূর্ণ ভাষা ও ভাবকে অনুসন্ধান ও যুক্তির দ্বার। নির্মমভাবে ভাঙিয়া দেখিতে হইতেছে। বর্তমান আন্দোলন যদি চন্দ্রনাথবাবু পূর্ব হইতে জানিতে পারিতেন তবে তাহার প্রবন্ধ আর-একরূপ হইত। তাহা হইলে তাহার প্রবন্ধে সাহিত্যরস অপেক্ষাকৃত অল্প থাকিত এবং তিনি তাহার বিষয়টিকে একমাত্র যুক্তির সাহায্যে দুর্গম পথের মধ্য দিয়া অতি সাবধানে লইয়া যাইতেন । তিনি যে বিবাহের কথা বলিয়াছেন তাহ সমাজের কোনো কাল্পনিক অবস্থায় ঘটিলেও ঘটিতে পারিত, কিন্তু আজকাল যে আন্দোলন উঠিয়াছে তাহ ভালোমনা পরিপূর্ণ সমাজের প্রাত্যহিক বিবাহ লইয়। কিন্তু র্তাহার উক্ত সাহিত্য-প্রবন্ধের ভাষা লইয়া আজকাল সকলেই কার্যস্থলে ব্যবহার করিতেছেন, সুতরাং কঠিন যুক্তির দ্বারা তাহার প্রবন্ধ সমালোচনা আবগুক হইয়া পড়িয়াছে। ইহাতে চন্দ্রনাথবাবুর দোষ নাই এবং আমারও দোষ নাই— ঘটনাক্রমেই এইরূপ হইয় পড়িল ।