পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাদশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৫৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


রবীন্দ্র-রচনাবলী سرانها 8 শিক্ষিত লোকের পক্ষপাত দেখা যায়, তবে তাহাদের দোষ দেওয়া যায় না। উহা অবশুম্ভাবী। ইংরেজি শিথিয়া যে কেবলমাত্র অন্নটুকু উপার্জন করিব তাহা হইতেই পারে না, ইংরেজি ভাব উপার্জন না করিয়া থাকিবার জো নাই। জলে প্রবেশ করিয়া মাছ ধরিতে গেলে ভিজিতেও হইবে । অতএব আধুনিক শিক্ষিত দলের মধ্যে অনেকেই যখন স্ত্রী গ্রহণ করেন তখন সেস্ত্রী যে কেবলমাত্র গৃহকার্য নিপুণরূপে সম্পন্ন করিবে, ও তাহাকেই দেবতা জ্ঞান করিবে, ইহাই মনে করিয়া সস্তুষ্ট থাকেন না । সে-স্ত্রীর স্বাভাবিক গুণ ও শিক্ষা তাহারা দেখিতে চান, এবং র্যাহারা ভাবী সন্তানের স্বাস্থ্যের কথা ভাবেন, তাহারা স্ত্রীর কোনো স্থায়ী রোগপ্রবণতা বা অঙ্গহীনতা না থাকে তাহার প্রতিও দৃষ্টি রাখিতে চান। কিন্তু সকলেই যে এইরূপ বিচার করিয়া বিবাহ করিবেন তাহ বলি না। অনেকেই ধন রূপ বা যৌবন -মোহে মুগ্ধ হইয়া বিবাহ করিবেন। বর্তমান হিন্দুবিবাহেও সেরূপ হইয়া থাকে। অক্ষয়বাবু তাহার বক্তৃতায় কায়স্থবিবাহে দরদামের প্রাবল্য এবং কুলশীলের প্রতি উপেক্ষা সম্বন্ধে যাহা বলিয়াছেন, তাহা কাহারও অগোচর নাই । প্রচলিত বিবাহে কম্ভার রূপে মুগ্ধ হইয়াও যে কন্যা নির্বাচন হয় না, তাহাও ঠিক বলিতে পারি না। ইহার যা ফল তাহা এখনও হয় পরেও হইবে । পিতার ধনমদে মত্ত বধু ঔদ্ধত্য প্রকাশ করিয়া অনেক সময়ে দরিদ্র পতিকুলের অশাস্তির কারণ হইয়া থাকে ; এবং অক্ষমতাবশত দরিদ্র পিতা কম্ভার বিবাহের পণ সম্বন্ধে কোনো ক্রটি করিলে অভাগিনী কন্যাকে তজ্জন্ত বিস্তর লাঞ্ছনা ভোগ করিতে হয় । অতএব কেবলমাত্র ধনযৌবনের প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া কস্তানির্বাচন করিলে তাহার যা ফল তাহা ভোগ করিতে হইবে । কিন্তু র্যাহারা গুণ দেখিয়া কন্যা বিবাহ করিতে চান, বাল্যবিবাহে তাহাদের সম্পূর্ণ অসুবিধা । চরিত্রবিকাশ না হইলে কন্যার গুণাগুণ বিষয়ে কিছুই জানা যায় না। কন্যা বড়ো হইয়াই যে সত্যনিষ্ঠ সদ্বিবেচক প্রিয়বাদিনী ও হিতানুষ্ঠাননিরতা হইবে তাহ বলা যায় না। অনেক শিশুস্ত্রী বড়ো হইয়া নানাবিধ বৃথা অভিমানে ও উত্তরোত্তর-বিকাশমান হীন স্বভাব-বশত ঝগড়া-বিবাদ ও ঘরভাঙাভাঙি করিয়া থাকে। এবং অনেকে অগত্যা বধূদশ নিরুপদ্রবে যাপন করিয়া যথাসময়ে প্রচণ্ড শাশুড়িমূর্তি ধারণ করিয়া অকারণে নিজ বধূর প্রতি যৎপরোনাস্তি নিপীড়ন, অধীনাগণকে তাড়ন ও গৃহের শাস্তিভঙ্গ করিয়া থাকেন। তর্কস্থলে কী করিবেন জানি না, কিন্তু আমাদের সমাজে এরূপ শাশুড়ির বহুল অস্তিত্ব কেহ অস্বীকার করেন না। অতএব বাল্যবিবাহেই যে স্বগৃহিণী উৎপন্ন হইয়া থাকে, যৌবনবিবাহে হয় না, তাহা কেমন করিয়া বলিব ।