পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাদশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৬৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


88ર রবীন্দ্র-রচনাবলী সহিয়া থাকিতে হইবে, ইহা এখন সকলে মানে না। যে-কারণে শাস্ত্রের অনুশাসন শিথিল হইয়া আসিতেছে, জ্যেষ্ঠের প্রতি কনিষ্ঠের নির্বিচার ভক্তিবন্ধন সেই কারণেই শিথিল হইয়া আসিতেছে। এ স্থলে আরেকটি বিষয় বিচার্য । তাহা শিক্ষার বৈষম্য। যে ভালোরূপ ইংরেজি শিখিয়াছে এবং যে শেখে নাই, তাহাদের মধ্যে গুরুতর ব্যবধান পড়িয়াছে। তাহাদের চিন্তাপ্রণালী সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র হইয়া গিয়াছে। পূর্বে বিদ্বান-মুখের মধ্যে এরূপ প্রভেদ ছিল না। তখন একজন বেশি জানিত আরেকজন কম জানিত, এইমাত্র প্রভেদ ছিল । এখন একজন একরূপ জানে, আরেকজন অন্তরূপ জানে । এই জন্ত অনেক সময়ে দেখা যায়, উভয়ে উভয়কে জানে না। সামান্ত বিষয়ে পরস্পর পরস্পকে ভুল বুঝে, এই জন্ত উভয়ের তেমন ঘনিষ্ঠভাবে একত্র থাকা প্রায় অসম্ভব । অতএব দেখা যাইতেছে, এক সময়ে একান্নবর্তী প্রথা থাকাতে অনেক সুবিধা ছিল এবং তাহাতে মানবপ্রকৃতির অনেক উন্নতি সাধন করিত । কিন্তু এখন অবস্থাভেদে তাহার সুবিধাগুলি চলিয়া যাইতেছে এবং তাহার মধ্যে যে উন্নতির কারণ ছিল তাহাও নষ্ট হইতেছে। পূর্বে জটিলতাবিহীন সমাজে যে-সকল মুখ সম্পদ ও শিক্ষা লভ্য ছিল, তাহা একান্নবর্তী পরিবারের মধ্যে থাকিয়াই সকলে পাইত। এখন একান্নবর্তী পরিবারে থাকে বলিয়াই অনেকে সে-সকল হইতে বঞ্চিত হইতেছে । আমি প্রাণপণে উপার্জন করিয়া যে-অর্থ সঞ্চয় করিতেছি, তাহাতে কোনোমতে আমার পুত্রের শিক্ষা দিয়া তাহার যাবজ্জীবন উন্নতির মূলপত্তন করিয়া দিতে পারি ; কিন্তু আমি আমার পুত্রের অহিতসাধন করিয়া আমার খালকপুত্রের কথঞ্চিৎ উদরপূর্তি করিব,ইহাকে সকলের মহৎ উদ্দেশু মনে না হইতেও পারে। যদি ইচ্ছা কর তো সন্তানোৎপাদন বন্ধ করিয়া অপরের সন্তানের উন্নতিসাধনে প্রাণপণ করিতে পার, তাহাতে তোমার মহত্ত্ব প্রকাশ পাইবে ; কিন্তু যদি তোমার নিজের সস্তান জন্মে তবে সর্বাপেক্ষা প্রবল স্নেহ ও কর্তব্যস্বত্রে তোমার সহিত বদ্ধ যে-আত্মজ, তাহার সম্যক উন্নতিবিধানের জন্ত তুমি প্রধানত দায়ী। পূর্বে শ্বালকপুত্রের সহিত নিজ পুত্রের প্রভেদ করিবার কোনো আবশ্বকত। ছিল না, কারণ তখন আমাদের অন্নপূর্ণ বঙ্গভূমি র্তাহার সকল সস্তানকে একত্রে কোলে লইয়া সকলের মুখে অন্ন তুলিয়া দিতে পারিতেন, তাহার ভাণ্ডার এমন পরিপূর্ণ ছিল ; এখন চারিদিকে অন্ন নাই অন্ন নাই রব উঠিয়াছে, এখন পিতা স্বয়ং আপন ক্ষুধিত সন্তানের মুখ না চাহিলে উপায় কী । দ্বিতীয় কথা, পূর্বকালে একান্নবর্তী পরিবারে প্রতিভাবের অত্যন্ত চর্চা হইত। এ জন্য তাহা দেশের একটি মহৎ আশ্রম বলিয়া গণ্য হইত। কিন্তু এখন সাধারণের অবস্থাভেদে শিক্ষাভেদে শাস্ত্রভেদে মতভেদে ও