পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাদশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৭৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8@br রবীন্দ্র-রচনাবলী বৎসল জুষ্টিনিয়নের অধিকারকালে কনস্টটিনোপলের রাজপথ স্ত্রীলোকের প্রতি কি নিদারুণ অত্যাচারের দৃপ্তস্থল ছিল। একটি স্ত্রীলোক স্বন্দরী এবং বিদুষী ছিলেন, এইমাত্র অপরাধে কোনো খৃষ্টান সাধুর অল্পচরগণ র্তাহাকে আলেক্জাস্ক্রিয়ার রাজপথে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করিয়া বধ করিয়াছিল। লেখক বলিতেছেন, হিন্দু ধর্মশাস্ত্রকার মন্থর অনুশাসন আছে যে, স্ত্রী স্বামীর অবাধ্য হইলে তাহাকে চতুষ্পথে ডালকুত্তার দ্বারা টুকরা টুকরা করিয়া ফেলাই বিধান – যদি সেন্ট সীরিল স্ত্রীলোক সম্বন্ধে কোনো গ্রন্থ লিথিতেন তবে কি মহুর সহিত র্তাহার মতের সম্পূর্ণ ঐক্য হইত না। যুরোপের মধ্যযুগে স্ত্রীলোক সদাসর্বদাই উৎপীড়িত, বলপূর্বক অপহৃত, কারামধ্যে বন্দীকৃত, এবং পরমথুষ্টান যুরোপের উপরাজগণের দ্বারা কশাহত হইত। খৃষ্টানগণ তাহাদিগকে দগ্ধ করিতে, জলমগ্ন করিতেও কুষ্ঠিত হইত না । এমন সময়ে মহম্মদের আবির্ভাব হইল । মর্তলোকে স্বৰ্গরাজ্যের আসন্ন আগমন প্রচার করিয়া লোকসমাজে একটা হুলস্থূল বাধাইয়া দেওয়া তাহার উদ্দেশু ছিল না। সে-সময়ে আরব সমাজে যে-উচ্ছৃঙ্খলতা ছিল তাহাই যথাসম্ভব সংযত করিতে তিনি মনোনিবেশ করিলেন। পূর্বে বহুবিবাহ, দাসীসংসর্গ ও যথেচ্ছ স্ত্রীপরিত্যাগের কোনো বাধা ছিল না ; তিনি তাহার সীমা নির্দিষ্ট করিয়া দিয়া স্ত্রীলোককে অপেক্ষাকৃত মান্তপদবীতে আরোপণ করিলেন । তিনি বার বার বলিয়াছেন, স্ত্রীবর্জন ঈশ্বরের চক্ষে নিতান্ত অপ্রিয় কার্য। কিন্তু এ প্রথা সমূলে উৎপাটিত করা কাহারও সাধ্যায়ত্ত ছিল না। এইজন্ত তিনি স্ত্রীবর্জন একেবারে নিষেধ না করিয়া অনেকগুলি গুরুতর বাধার স্বষ্টি করিলেন । লেখক বলেন, স্ত্রীলোকের অধিকার সম্বন্ধে খৃষ্টীয় আইন অপেক্ষ মুসলমান আইনে অনেক উদারতা প্রকাশ পায়। হিন্দুশাস্ত্রে যেমন বিশেষ বিশেষ কারণে স্বামীত্যাগের বিধি আছে কিন্তু হিন্দুসমাজে তাহার কোনো চিহ্ন নাই, সেইরূপ লেখক বলেন, মুসলমানশাস্ত্রেও অত্যাচার, ভরণপোষণের অক্ষমতা প্রভৃতি কারণে স্ত্রীর স্বামীত্যাগের অধিকার অাছে । আমরা যেরূপ লীলাবতী ও খনার দৃষ্টান্ত সর্বদা উল্লেখ করিয়া থাকি, লেখক সেইরূপ প্রাচীন কালের মুসলমান বিদুষীদের দৃষ্টান্ত সংগ্ৰহ করিয়া তৎকালীন আরব-রমণীদের উন্নত অবস্থা প্রমাণ করিয়াছেন । যাহা হউক, মান্থাবর আমির আলি মহাশয় প্রমাণ করিয়াছেন যে, কোনো কোনো বিষয়ে মুসলমানদের প্রাচীন সামাজিক আদর্শ উচ্চতর ছিল এবং মহম্মদ যে-সকল সংস্কারকার্ষের স্বত্রপাত করিয়াছিলেন, তাহাকেই তিনি চূড়ান্ত স্থির করেন নাই ।