পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাদশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৫৯২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শব্দতত্ত্ব (t\9:) গোবিন্দদাস রাধিকার বর্ণনাস্থলে লিখিয়াছেন : নব অমুরাগিণী অখিল সোহাগিনী পঞ্চম রাগিণী মোহিনী রে । গোবিন্দদাস মহাশয়ের বলিবার অভিপ্রায় এরূপ নহে যে, রাধিকার রাগ সর্বদ। পঞ্চমেই চড়িয়া আছে। ইহা হইতে স্পষ্ট দেখা যাইতেছে, সংগীতের রাগিণী’ কথাটা সংস্কৃত প্রত্যয়ের দ্বারা তৈরি । ‘অকুরাগী” কথাটাও সেইরূপ । পণ্ডিতমশায় বলিবেন, সে যেমনই হউক, এ সমস্তই সংস্কৃতভাষার ব্যবহার হইতে উৎপন্ন ; আমিও সে কথা স্বীকার করি। প্রমাণ হইয়াছে, একই মূল হইতে 'হংস এবং ইংরেজি গ্যাণ্ডার’ শব্দ উৎপন্ন। কিন্তু তাই বলিয়া গ্যাণ্ডার সংস্কৃত হংস শব্দের ব্যাকরণগত নিয়ম মানে না, এবং তাহার স্ত্রীলিঙ্গে গ্যাণ্ডারী’ না হইয় গুস্থ হয়। ইহাও প্রমাণ হইয়াছে, একই আর্যপিতামহ হইতে বপ, বাণুফ প্রভৃতি যুরোপীয় শাব্দিক ও বাঙালি ব্যাকরণজ্ঞ পণ্ডিত জন্মিয়াছেন, কিন্তু যুরোপীয় পণ্ডিতরা ব্যাকরণকে ষ্ণে-বিজ্ঞানসম্মত ব্যাপকভাবে দেখেন, আমাদের পণ্ডিতরা তাহ দেখেন না ; অতএব উৎপত্তি এক হইলেও ব্যুৎপত্তি ভিন্ন প্রকারের হওয়া অসম্ভব নহে। ইন প্রত্যয় হইতে বাংলা ই প্রত্যয় উৎপন্ন হইয়াছে বটে, তবু তাহা ইন প্রত্যয়ের সমস্ত নিয়ম মানিয়া চলে না ; এইজন্য এই দুটিকে ভিন্ন কোঠায় না ফেলিলে কাজ চালাইবার অসুবিধা হয়। লাঙলের ফলার লোহা হইতে ছুচ তৈরি হইতে পারে, কিন্তু তাই বলিয়৷ সেই ছুচ দিয়া মাটি চষিবার চেষ্টা করা পাণ্ডিত্য নহে। বস্তুত প্রত্যেক ভাষার নিজের একটা ছাচ আছে। উপকরণ যেখান হইতেই সে সংগ্রহ করুক, নিজের ছাচে ঢালিয়া সে তাহাকে আপনার সুবিধামতো বানাইয় লয়। সেই ছাচটাই তাহার প্রকৃতিগত, সেই ছাচেই তাহার পরিচয়। উজু ভাষায় পারসি আরবি কথা ঢের আছে, কিন্তু সে কেবল আপনার ছাচেই চতুর ভাষাতত্ত্ববিদের কাছে হিন্দির বৈমাত্র সহোদর বলিয়া ধরা পড়িয়া গেছে। আমাদের বাঙালি কেহ যদি মাথায় হ্যাট, পায়ে বুট, গলায় কলার এবং সর্বাঙ্গে বিলাতি পোশাক পরেন, তৰু তাহার রঙে এবং দেহের ছাচে কুললক্ষণ প্রকাশ হইয় পড়ে। ভাষার সেই প্রকৃতিগত ছাচটা বাহির করাই ব্যাকরণকারের কাজ। বাংলায় সংস্কৃতশব্দ ক'টা আছে, তাহার তালিকা করিয়া বাংলাকে চেনা যায় না, কিন্তু কোন বিশেষ ছাচে পড়িয়া সে বিশেষরূপে বাংলা হইয়া উঠিয়াছে, তাহা সংস্কৃত ও অন্য ভাষার আমদানিকে কী ছাচে ঢালিয়া আপনার করিয়া লয়, তাহাই নির্ণয় করিবার জন্য বাংলাব্যাকরণ। সুতরাং ভাষার এই আসল ছাঁচটি বাহির করিতে গেলে, এখনকার ঘরগড়া কেতাবি ভাষার