পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাদশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৬৩০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গ্রন্থপরিচয় ج م ما এ খ্যাপামি শিখেছি সেই খ্যাপার কাছ থেকে যিনি জ্যৈষ্ঠের হোমহুতাশনের ভর। দাহনের মধ্যে সজলজলদস্নিগ্ধকাস্ত আষাঢ়ের অভিষেক-উৎসবের নিমন্ত্রণপত্র জারি করে বসেন কদম্বের নবকিশলয়ে। যিনি পাতাঝরা উত্তরে হাওয়ার স্বর এক মুহূর্তে ফিরিয়ে দিয়ে বনসভায় দক্ষিণ হাওয়ার আসর জমিয়ে তোলেন। বর্ষার শিঙাখানা কেড়ে নিয়ে তাতেই যদি বসন্তের বাশি বাজিয়ে তুলতে না পারি তবে আমি কবি কিসের। পুষ্পবনে পুপ নাহি আছে অন্তরে । পরানে বসন্ত এল কণর মন্তরে | শ্ৰীযুক্ত মনোরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়কে একটি পত্রে (শিলাইদহ, ২০ মাঘ ১৩২২ ) রবীন্দ্রনাথ লিখিয়াছিলেন : ফাল্গুনীর ভিতরকার কথাটি এতই সহজ যে, ঘটা করে তার অর্থ বোঝাতে সংকোচ বোধ হয় । জগংটার দিকে চেয়ে দেখলে দেখা যায় যে, যদিচ তার উপর দিয়ে যুগ যুগ চলে যাচ্ছে তবু সে জীর্ণ নয়— আকাশের আলে। উজ্জ্বল, তার নীলিম নির্মল । ধরণীর মধ্যে রিক্ততা নেই, তার শু্যামলতা অম্লান – অথচ খণ্ড খণ্ড করে দেখতে গেলে দেখি ফুল ঝরছে, পাতা শুকচ্ছে, ডাল মরছে। জরামুত্যুর আক্রমণ চারিদিকেই দিনরাত চলেছে, তবুও বিশ্বের চিরনবীনতা নিঃশেষ হল না। Facts-এর দিকে দেখি জরা মৃত্যু, Truth-এর দিকে দেখি অক্ষয় জীবন যৌবন । শীতের মধ্যে এসে যে-মুহূর্তে বনের সমস্ত ঐশ্বর্য দেউলে হল বলে মনে হল সেই মুহূর্তেই বসন্তের অসীম সমারোহ বনে বনে ব্যাপ্ত হয়ে পড়ল। জরাকে, মৃত্যুকে ধরে রাখতে গেলেই দেখি, সে আপন ছদ্মবেশ ঘুচিয়ে প্রাণের জয়পতাকা উড়িয়ে দাড়ায় । পিছনদিক থেকে যেটাকে জর বলে মনে হয় সামনের দিক থেকে সেইটেকেই দেখি যৌবন । ত| যদি না হত তা হলে অনাদি কালের এই জগংট। আজ শতজীর্ণ হয়ে পড়ত— এর উপরে যেখানে পা দিতুম সেইখানেই ধসে যেত । * বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে প্রতি ফাঙ্কনে চিরপুরাতন এই যে চিরনূতন হয়ে জন্মাচ্ছে, মানুষ প্রকৃতির মধ্যেও পুরাতনের সেই লীলা চলছে। প্রাণশক্তিই মৃত্যুর ভিতর দিয়ে আপনাকে বারে বারে নূতন করে উপলব্ধি করছে। যা চিরকালই আছে তাকে কালে কালে হারিয়ে হারিয়ে না যদি পাওয়া যায় তবে তার উপলব্ধিই থাকে না । ফাল্গুনীর যুবকের দল প্রাণের উদাম বেগে প্রাণকে নিঃশেষ করেই প্রাণকে অবিক করে পাচ্ছে। সর্দার বলছে, ভয় নেই, বুড়োকে আমি বিশ্বাসই করি নে— আচ্ছ। দেখ, যদি তাকে ধরতে পারিস তো ধর। প্রাণের প্রতি গভীর বিশ্বাসের জোরে চন্দ্ৰহাস মৃত্যুর গুহার মধ্যে প্রবেশ করে সেই প্রাণকেই নূতন করে – চিরন্তন করে দেখতে পেলে । যুবকের দল বুঝতে পারলে জীবনকে যৌবনকে বারে বারে হারাতে হবে, নইলে ফিরে পাবার উৎসব হতে পারবে না। শীত না থাকলে ফাল্গুনের মহোৎসবের মহাসমারোহ তো মারা যেত ।