পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাদশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৬৩৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


৬১২ রবীন্দ্র-রচনাবলী আজ মহাভারতবর্ষ গঠনের ভার আমাদের উপর । সমুদয় শ্রেষ্ঠ উপকরণ লইয়া আজ আমাদের এক মহাসম্পূর্ণতাকে গঠিত করিয়া তুলিতে হইবে। গত্তিবদ্ধ থাকিয়৷ ভারতের ইতিহাসকে যেন আমরা দরিদ্র করিয়া না তুলি । ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ অধুনাতন মনীষিগণ এ কথা বুঝিয়াছিলেন, তাই তাহারা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যকে মিলাইয়া কার্য করিয়া গিয়াছেন। দৃষ্টাস্তস্বরূপ রামমোহন রায়, রানাডে এবং বিবেকানন্দের নাম করিতে পারি। ইহার প্রত্যেকেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্ত্যের সাধনাকে একীভূত করিতে চাহিয়াছেন ; ইহারা বুঝাইয়াছেন যে, জ্ঞান শুধু এক দেশ বা জাতির মধ্যে আবদ্ধ নহে ; পৃথিবীর যে-দেশেই যে-কেহ জ্ঞানকে মুক্ত করিয়াছেন, জড়ত্বের শৃঙ্খল মোচন করিয়া মানুষের অস্তনিহিত শক্তিকে উন্মুখ করিয়া দিয়াছেন তিনিই আমাদের আপন— তিনি ভারতের ঋষি হউন বা প্রতীচ্যের মনীষী হউন— তাহাকে লইয়া আমরা মানবমাত্রেই ধন্য । বঙ্কিমচন্দ্রও অসীম প্রতিভাবলে বাংলাসাহিত্যে পশ্চিম এবং পূর্বের মিলন সাধন করিয়া বঙ্গসাহিত্যকে পূর্ণ পরিণতির পথে অগ্রসর করাইয়া, কম সার্থক করিয়া তোলেন নাই । অতএব, আজ আমাদের এই মিলনের সাধনা করিতে হইবে ; রাজনৈতিক বললাভের জন্য নহে, মচুন্যত্বলাভের জন্য ; স্বাৰ্থৰুদ্ধির পথ দিয়া নহে, ধর্মবুদ্ধির মধ্য দিয়া । কিন্তু আজ এই মিলনের পথে যে-বিরোধ আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে, ইহা কি মিলনের পক্ষে সম্পূর্ণ প্রতিকুল। তাহী নহে। আমাদের ভক্তিতত্ত্বে বিরোধও মিলনসাধনার একটা অঙ্গস্বরূপ । কারণ, অসত্যকে অবলম্বন করিয়া সত্যের নিকট যেপরাজয়, তাহার মতো স্থায়ী লাভ আর নাই । অসংশয়ে বিনা বিচারে যাহা গ্রহণ করিলাম, তাহাতে আমার প্রতিষ্ঠা থাকে কোথায় । আজ আমরা আমাদের জীবনের মাঝে এক অবমাননার বেদন অনুভব করিতেছি । এতদিন আমরা নিজের মর্যাদার প্রতি লক্ষ না রাখিয়া শুধুই অপরের দান গ্রহণ করিয়া আসিতোছলাম। আত্মমর্যাদার প্রস্তরে ঘসিয়া তাহার মূল্য যাচাই করিয়া তাহাকে আপনার করিয়া লইতে এত দিন পারি নাই । কাজে কাজেই সে দান আমাদের অস্তরে মিশিতে পায় নাই, তাহা শুধু বাহিরের পোষাক জিনিস হইয়া উঠিতেছিল। সে যে দান নহে, সে যে শুধু অপমান, আজ তাহা আমরা আমাদের ক্ষুণ্ণ মর্যাদায় স্পষ্টই উপলব্ধি করিতেছি এবং এই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার প্রভাবেই আজ যত বিরোধ উপস্থিত হইতেছে। আপনার মর্যাদায় দণ্ডায়মান হইয়া যেদিন অপরের দান লইতে পারিব সেইদিন সে-গ্রহণে সার্থকতা, কারণ তাহাতে নীচতা নাই— সে-দান তখন আমাদের অন্তরাত্বার সহিত যথার্থ মিশিয়া আমাদের এই অতৃপ্তি অশান্তি বিদূরিত করিতে সমর্থ হইবে। মহাত্ম রামমোহন দীনের ন্যায় পাশ্চাত্ত্যের চরণতলে উপস্থিত হন নাই, তিনি শুধু প্রতীচ্যের জ্ঞানে আপনার জ্ঞানের অসম্পূর্ণতাটুকুকে পূর্ণ করিতে চাহিয়াছিলেন মাত্র । এবং সেইজন্যই তিনি প্রাচ্যের জ্ঞানরত্নভাণ্ডার-দ্বারে দাড়াইয়া গর্বের সহিত প্রতীচ্যের মুক্তারাজি আহরণ করিয়া তাহাদিগকে যথার্থ আপনার করিয়া তুলিতে পারিয়াছিলেন ।