পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাদশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৬৫৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


৬৩৬ । রবীন্দ্র-রচনাবলী ব্যাকরণের অন্তর্গত শব্দসমষ্টি ছাড়া ভাষার আর-একটি দিক যে আছে, তাহ দেখাইয় দেওয়া তাহার উদেষ্ঠ . প্রত্যয়াদির রূপ রবীন্দ্র যাহা স্থির করিয়াছেন তাহাই হউক, আর অন্তরূপই হউক, তাহাতে বড়ো ক্ষতিবৃদ্ধি নাই। তাহা আলোচনার মুখে স্থির হইবে। ১৩১১ সালে পরিষদের প্রথম বিশেষ অধিবেশনে ( ১৪ জ্যৈষ্ঠ ) রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক ‘ভাষার ইঙ্গিত প্রবন্ধটি পাঠের পর যে-আলোচনা হয় তাহাতে সভায় উপস্থিত ব্যক্তিগণের মধ্যে সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ’, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ং ও ১ বাংলাভাষার গতিনির্দেশ ও লক্ষকারীদিগের দুই দল। এক দলের নেতা রবীন্দ্রবাবু। সামান্ত হইতে উচ্চশ্রেণীর লোকে কথাবার্তার ভাষায় যে-সকল শব্দ ব্যবহার করে, সেগুলি লেখার ভাষায় আমরা ব্যবহার করি না। তৎপরিবর্তে অন্ত শব্দ স্বষ্টি করিয়া যদি ব্যবহার করি— তাহা হইলে ভাষার জীবনীশক্তি থাকে না । কথিত ভাষার শব্দের শক্তি ও মাধুর্য রবীন্দ্রবাবু দ্বারা প্রকাশিত হইতেছে, তিনি তাহ অনুভব করিয়াছেন। র্তাহার 'ধ্বস্তাত্মক শব্দ’ প্রভৃতি প্রবন্ধ ইহারই ফল। এ-সকল চলিত কথার শব্দ প্রদেশভেদে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন অর্থেও ব্যবহৃত হয়। ধ্বস্তাত্মক শব্দ পরিবর্তনশীল। সংস্কৃতসাহিত্যেও অল্পসংখ্যক ধ্বস্তাত্মক শব্দ দেখা যায়। এই-সকল ধ্বস্তাত্মক শব্দ সাহিত্যে ব্যবহার করা বড়ো কঠিন। ধ্বস্তাত্মক শব্দগুলি জীবিত । শব্দ। সেগুলিকে রবীন্দ্রবাবুর কথিত নিয়মাদি দ্বারা শ্রেণীবদ্ধ করিয়া ব্যাকরণের আবরণ দিয়া পাঠ করিতে গেলে, তাহদের মাধুর্য নষ্ট হইবে বলিয়া মনে হয়। এ যুগের শব্দরহস্ত সংগৃহীত হউক, কিন্তু সাহিত্যে তাহাদের বহুল ব্যবহার প্রার্থনীয় নহে –সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ । ২ আমিও রবীন্দ্রবাবুকে র্তাহার এই অপূর্ব গবেষণামূলক প্রবন্ধের জন্ত আন্তরিক ধন্যবাদ জানাইতেছি। আপনার জোড়াতাড়া দিয়া লউন । ভাষার ইঙ্গিত সকল বিষয়েই আছে। ভাষাতত্ত্ববিদেরা বলেন, এই-সকল ধ্বস্তাত্মক শব্দ দ্বিবিধ, এক দল বলেন জন্তুধ্বনি হইতে, অপর দল বলেন মমুযুধ্বনি হইতে উৎপন্ন । ēst.TH ĒRGfè Rin Bow-ow Theory s Pugh-Pugh Theory i HistāTH FR2fsè Efi zilā জগদীশবাবু লব্ধপ্রাতষ্ঠ বৈজ্ঞানিক । জগদীশবাবু বলেন, এমন অনেক রঙ আছে যাহা এ চোখে দেখা যায় না— এ চোখের ততটা বোধশক্তি নাই । শক্তির বৃদ্ধি হইলে আবার এই চোখেই দেখা যায়। অব্যক্ত ধ্বনির শব্দগুলির রহস্তবোধ সেইরূপ সকলের কানে হয় না। যে-কনের বোধশক্তি বর্ধিত সে-কনে হয়, কবি রবীন্দ্রবাবুর তাহা হইয়াছে। বিদ্যাভূষণ মহাশয় উহাদের ক্ষণভঙ্গুর বলিয়া মনে করেন । যাই তাহ হয় তবে একটা-দুইটা হইতে পারে, কিন্তু তাহদের দল সমস্তই নহে। বিদ্যাভূষণ মহাশয় উহাদের বহুল ব্যবহার ইচ্ছা করেন না । তিনি না করিলেও লিখিত ভাষায় উহাদের প্রয়োজন আছে। নাটকে তাহার যথেষ্ট উদাহরণ দেখা যায়। অপণ্ডিত ব্যক্তির কথোপকথন লিপিবদ্ধ করিতে হইলে উহাদের প্রয়োজন। এই-সকল শব্দ এত ছোটো যে, দু-একজন সহৃদয় কবি ইহাদের স্বরূপ দেখিতে চাহেন না। রবিবাবু একজন বৈজ্ঞানিক কবি । তিনি ইহাদের স্বরূপ যেভাবে দেখাইয়াছেন, তাহাতে উহাদের আর ছোটোতৃ নাই । তবে রবীন্দ্রবাবু বড়ো নজরে উহাদিগকে যতই ছোটো দেখুন, আমাদের কাছে এগুলি এখন অতি বড়ে জিনিস। ভাষার প্রাকৃতত্ব এখন উহাদের উপরে নির্ভর করিতেছে। রবীন্দ্রবাবুর একটা কথার সহিত আমার মতভেদ আছে । বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় যে-সম্বন্ধ তাহ দেহ-পরিচ্ছদ সম্বন্ধ নহে ; দেহের উৎকৃষ্ট অংশ বটে। দেহ-পরিচ্ছদ সম্বন্ধ হইলে বাংলাভাষাকে শবদেহ বলিতে হয়, কিন্তু তাহা নহে। জীবনীশক্তি বাংলাতেও আছে শব্দরূপ, ধাতুরূপ, সব বাংলা। কোনোটা একটু বধিত কোনোটা একটু কর্তিত, ইহা দ্বার আমি যেমন বাংলাভাষাকে একটু বাড়াইলাম তেমনই একটু কমাইয়াও দিলাম। তর্কের খাতিরে কাহাকেও অপদস্থ করিতে নাই। ষাহার যে নাম সেই নামে ডাকিলে শীঘ্র ডাক শোনা যায় —গুরুদাস বন্দোপাধ্যায়।