পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২২৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ । Տծ ձ কিন্তু সেদিন সহসা এ কী দেখিলাম। আমার চন্দ্রলোকেও কি এখনে অগ্ন্যুৎপাত আছে। সেখানকার জনশূন্ত সমাধিমগ্র গিরিগুহার সমস্ত বহিদাহ এখনে সম্পূর্ণ নির্বাণ হইয়া যায় নাই কি । সেদিন বৈশাখ মাসের অপরাত্নে ঈশান কোণে মেঘ ঘনাইয়া আসিতেছিল। সেই আসন্ন ঝঞ্চার মেঘবিচ্ছুরিত রুদ্রদীপ্তিতে আমার প্রতিবেশিনী জানালায় একাকিনী দাড়াইয়া ছিল। সেদিন তাহার শূন্তনিবিষ্ট ঘনকৃষ্ণ দৃষ্টির মধ্যে কী স্থদুরপ্রসারিত নিবিড় বেদনা দেখিতে পাইলাম । আছে, আমার ওই চন্দ্রলোকে এখনো উত্তাপ আছে ! এখনো সেখানে উষ্ণ নিশ্বাস সমীরিত। দেবতার জন্য মানুষ নহে, মানুষের জন্যই সে । তাহার সেই দুটি চক্ষুর বিশাল ব্যাকুলতা সেদিনকার সেই ঝড়ের আলোকে ব্যগ্র পাখির মতো উড়িয়া চলিয়াছিল। স্বর্গের দিকে নহে, মানবহৃদয়নীড়ের দিকে। । সেই উৎসুক আকাজক্ষা-উদ্দীপ্ত দৃষ্টিপাতটি দেখার পর হইতে অশাস্ত চিত্তকে স্বস্থির করিয়া রাখা আমার পক্ষে দুঃসাধ্য হইল । তখন কেবল পরের কাচা কবিতা সংশোধন করিয়া তৃপ্তি হয় না— একটা যে-কোনোপ্রকার কাজ করিবার জন্ত চঞ্চলতা জন্মিল । তখন সংকল্প করিলাম, বাংলাদেশে বিধবাবিবাহ প্রচলিত করিবার জন্য আমার সমস্ত চেষ্টা প্রয়োগ করিব । কেবল বক্তৃতা ও লেখা নহে, অর্থসাহায্য করিতেও অগ্রসর হইলাম। নবীন আমার সঙ্গে তর্ক করিতে লাগিল ; সে বলিল, “চিরবৈধব্যের মধ্যে একটি পবিত্র শাস্তি আছে, একাদশীর ক্ষীণ জ্যোৎস্নালোকিত সমাধিভূমির মতো একটি বিরাট রমণীয়তা অাছে ; বিবাহের সম্ভাবনামাত্রেই কি সেটা ভাঙিয়া যায় না।” এ-সব কবিত্বের কথা শুনিলেই আমার রাগ হইত। দুভিক্ষে যে লোক জীর্ণ হইয়া মরিতেছে তাহার কাছে আহারপুষ্ট লোক যদি খাদ্যের স্কুলত্বের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করিয়া ফুলের গন্ধ এবং পাখির গান দিয়া মুমূর্ষর পেট ভরাইতে চাহে তাহ হইলে সে কেমন হয়। আমি রাগিয়া কহিলাম, “দেখে। নবীন, আর্টিস্ট লোকে বলে, দৃপ্ত হিসাবে পোড়ে বাড়ির একটা সৌন্দর্য আছে। কিন্তু বাড়িটাকে কেবল ছবির হিসাবে দেখিলে চলে না, তাহাতে বাস করিতে হয়, অতএব আর্টিস্ট, যাহাই বলুন, মেরামত আবশ্যক। বৈধব্য লইয়া তুমি তো দূর হইতে দিব্য কবিত্ব করিতে চাও, কিন্তু তাহার মধ্যে একটি আকাঙ্ক্ষাপূর্ণ মানবহৃদয় আপনার বিচিত্র বেদন লইয়া বাস করিতেছে, সেটা স্মরণ রাখা কর্তব্য ।” २२> ¢