পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৩৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ ২১৩ আমরা দুজনে ছাড়া কেউ বুঝতে পারত না, বেশ মজা হত। অমল, তুমি একবার লেখবার চেষ্টা করে দেখো-না, নিশ্চয় তুমি পারবে। অমল কহিল, “আচ্ছ, যদি লিখতে পারি তো আমাকে কী দেবে।” চারু কহিল, “তুমি কী চাও।” অমল কহিল, “আমার মশারির চালে আমি নিজে লতা একে দেব, সেইটে তোমাকে আগাগোড়া রেশম দিয়ে কাজ করে দিতে হবে।” চারু কহিল, “তোমার সমস্ত বাড়াবাড়ি। মশারির চালে আবার কাজ !” মশারি জিনিসটাকে একটা শ্রীহীন কারাগারের মতো করিয়া রাখার বিরুদ্ধে অমল অনেক কথা বলিল। সে কহিল, সংসারের পনেরো-আনা লোকের যে সৌন্দর্যবোধ নাই এবং কুত্ৰত তাহদের কাছে কিছুমাত্র পীড়াকর নহে ইহাই তাহার প্রমাণ । চারু সে কথা তৎক্ষণাং মনে মনে মানিয়া লইল এবং ‘আমাদের এই দুটি লোকের নিভৃত কমিটি যে সেই পনেরো-আনার অন্তর্গত নহে? ইহা মনে করিয়া সে খুশি হইল । কহিল, "আচ্ছ বেশ, আমি মশারির চাল তৈরি করে দেব, তুমি লেখে।” অমল রহস্যপূর্ণভাবে কহিল, “তুমি মনে কর, আমি লিখতে পারি নে ?” চারু অত্যন্ত উত্তেজিত হইয়া কহিল, “তবে নিশ্চয় তুমি কিছু লিখেছ, আমাকে দেখাও।” অমল। আজ থাকৃ, বউঠান। চারু। না, আজই দেখাতে হবে— মাথা খাও, তোমার লেখা নিয়ে এসো গে। চারুকে তাহার লেখা শোনাইবার অতিব্যগ্রতাতেই অমলকে এতদিন বাধা দিতেছিল। পাছে চারু না বোঝে, পাছে তাহার ভালো না লাগে, এ সংকোচ সে তাড়াইতে পারিতেছিল না। অাজ খাতা আনিয়া একটুখানি লাল হইয়া, একটুখানি কাশিয়া, পড়িতে আরম্ভ করিল। চারু গাছের গুড়িতে হেলান দিয়া ঘাসের উপর পা ছড়াইয়া শুনিতে লাগিল । প্রবন্ধের বিষয়টা ছিল ‘আমার খাতা। অমল লিখিয়াছিল— ‘হে আমার শুভ্র খাতা, আমার কল্পনা এখনো তোমাকে স্পর্শ করে নাই। স্থতিকাগৃহে ভাগ্যপুরুষ প্রবেশ করিবার পূর্বে শিশুর ললাটপটের স্তায় তুমি নির্মল, তুমি রহস্যময়। যেদিন তোমার শেষ পৃষ্ঠার শেষ ছত্রে উপসংহার লিথিয়া দিব, সেদিন আজ কোথায় ! তোমার এই শুভ্র শিশুপত্রগুলি সেই চিরদিনের জন্ত মসীচিহ্নিত সমাপ্তির কথা আজ স্বপ্নেও কল্পনা করিতেছে না।’– ইত্যাদি অনেকখানি লিখিয়াছিল।