পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৪৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ २२१ অমল কখন নি:শব্দপদে পশ্চাতে আসিয়া দাড়াইল তাহা সে জানিতে পারিল না । বাদলার স্নিগ্ধ আলোকে চারু লিখিয়া গেল, অমল পড়িতে লাগিল। পাশে অমলেরই দুই-একটা ছাপানো লেখা খোলা পড়িয়া আছে ; চারুর কাছে সেইগুলিই রচনার একমাত্র আদশ । “তবে যে বল, তুমি লিখতে পার না!” হঠাৎ অমলের কণ্ঠ শুনিয়া চারু অত্যন্ত চমকিয়া উঠিল ; তাড়াতাড়ি খাত। লুকাইয়া ফেলিল ; কহিল, “তোমার ভারি অন্যায় ।” অমল। কী অন্যায় করেছি। চারু। কুকিয়ে মুকিয়ে দেখছিলে কেন । অমল। প্রকাশ্বে দেখতে পাই নে বলে। চারু তাহার লেখা ছিড়িয়া ফেলিবার উপক্রম করিল। অমল ফস করিয়া তাহার হাত হইতে খাত কাড়িয়া লইল । চারু কহিল, “তুমি যদি পড় তোমার সঙ্গে জন্মের মতো আড়ি ।” অমল । যদি পড়তে বারণ কর তা হলে তোমার সঙ্গে জন্মের মতে আড়ি । চারু। আমার মাথা খাও ঠাকুরপো, পোড়ো না । অবশেষে চারুকেই হার মানিতে হইল। কারণ, অমলকে তাহার লেখা দেখাইবার জন্য মন ছট্‌ফট্‌ করিতেছিল, অথচ দেখাইবার বেলায় ষে তাহার এত লজ্জা করিবে তাহ সে ভাবে নাই। অমল যখন অনেক অকুনয় করিয়া পড়িতে আরম্ভ করিল তখন লজ্জায় চারুর হাত-পা বরফের মতো হিম হইয়া গেল। কহিল, “আমি পান নিয়ে আসি গে।” বলিয়া তাড়াতাড়ি পাশের ঘরে পান সাজিবার উপলক্ষ করিয়া চলিয়া গেল । অমল পড়া সাঙ্গ করিয়া চারুকে গিয়া কহিল, "চমৎকার হয়েছে।” চারু পানে খয়ের দিতে ভুলিয়া কহিল, “যাও, আর ঠাট্টা করতে হবে না। দাও, অামার খাতা দাও।” অমল কহিল, “থাত এখন দেব না, লেখাটা কপি করে নিয়ে কাগজে পাঠাব।” চারু । হা, কাগজে পাঠাবে বৈকি ! সে হবে না। চারু ভারি গোলমাল করিতে লাগিল। অমলও কিছুতে ছাড়িল না। সে যখন বারবার শপথ করিয়া কহিল "কাগজে দিবার উপযুক্ত হইয়াছে।” তখন চারু যেন নিতান্ত হতাশ হইয়া কহিল, “তোমার সঙ্গে তো পেরে ওঠবার জো নেই! যেটা ধরবে সে আর কিছুতেই ছাড়বে না ।”