পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৫৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ ২৩৩ করিল। অমল মনে মনে কহিল, ‘বউঠানের এ কী দৌরাত্ম্য। তিনি কি ঠিক করিয়া রাথিয়াছেন, আমি তাহারই ক্রীতদাস । তাহাকে ছাড়া আর কাহাকেও পড়া শুনাইতে পারিব না। এ যে ভয়ানক জুলুম।" এই ভাবিয়া সে আরো উচ্চৈঃস্বরে মন্দাকে পড়িয়া শুনাইতে লাগিল । পড়া হইয়া গেলে চারুর ঘরের সম্মুখ দিয়া সে বাহিরে চলিয়া গেল। একবার চাহিয়া দেখিল, ঘরের দ্বার রুদ্ধ। চারু পদশব্দে বুঝিল, অমল তাহার ঘরের সম্মুখ দিয়া চলিয়া গেল— একবারও থামিল না। রাগে ক্ষোভে তাহার কান্না আসিল না। নিজের নূতন-লেখা খাতাখানি বাহির করিয়া তাহার প্রত্যেক পাতা বসিয়া বসিয়া টুকরা টুকরা করিয়া ছিড়িয়া স্তুপাকার করিল। হায়, কী কুক্ষণেই এই-সমস্ত লেখালেখি আরম্ভ হইয়াছিল। অষ্টম পরিচ্ছেদ সন্ধ্যার সময় বারান্দার টব হইতে জুইফুলের গন্ধ আসিতেছিল। ছিন্ন মেঘের ভিতর দিয়া স্নিগ্ধ আকাশে তারা দেখা যাইতেছিল। আজ চারু চুল বাধে নাই, কাপড় ছাড়ে নাই। জানলার কাছে অন্ধকারে বসিয়া আছে, মৃদুবাতাসে আস্তে আস্তে তাহার খোলা চুল উড়াইতেছে, এবং তাহার চোখ দিয়া এমন ঝর ঝর করিয়া কেন জল বহিয়া যাইতেছে তাহা সে নিজেই বুঝিতে পারিতেছে না। এমন সময় ভূপতি ঘরে প্রবেশ করিল। তাহার মুখ অত্যস্ত স্নান, হৃদয় ভারাক্রাস্ত । ভূপতির আসিবার সময় এখন নহে। কাগজের জন্য লিখিয়া প্রফ দেখিয়া অন্তঃপুরে আসিতে প্রায়ই তাহার বিলম্ব হয়। আজ সন্ধ্যার পরেই যেন কোন সাস্তুনা-প্রত্যাশায় চারুর নিকট আসিয়া উপস্থিত হইল। ঘরে প্রদীপ জলিতেছিল না। খোলা জানলার ক্ষীণ আলোকে ভূপতি চারুকে বাতায়নের কাছে অস্পষ্ট দেখিতে পাইল ; ধীরে ধীরে পশ্চাতে আসিয়া দাড়াইল । পদশব্দ শুনিতে পাইয়াও চারু মুখ ফিরাইল না— মূর্তিটির মতো স্থির হইয়া কঠিন হইয়া বসিয়া রহিল। ভূপতি কিছু আশ্চর্য হইয়া ডাকিল, “চারু।” ভূপতির কণ্ঠস্বরে সচকিত হইয়া তাড়াতাড়ি উঠিয়া পড়িল। ভূপতি আসিয়াছে সে তাহা মনে করে নাই। ভূপতি চারুর মাথার চুলের মধ্যে আঙুল বুলাইতে