পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৬৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ २8¢ আর যেমনি বিদায় লইবার একটুখানি ফাক পাইল অমনি কোমর বাধিয়া প্রস্তুত হইল, যেন এতদিন স্বযোগের অপেক্ষা করিতেছিল। অথচ মুখে কতই মিষ্ট, কতই ভালোবাসা। মানুষকে চিনিবার জো নাই। কে জানিত, যে লোক এত লিখিতে পারে তাহার হৃদয় কিছুমাত্র নাই।’ নিজের হৃদয়প্রাচুর্যের সহিত তুলনা করিয়া চারু অমলের শূন্ত হৃদয়কে অত্যন্ত অবজ্ঞা করিতে অনেক চেষ্টা করিল কিন্তু পারিল না। ভিতরে ভিতরে নিয়ত একটা বেদনার উদবেগ তপ্ত শূলের মতো তাহার অভিমানকে ঠেলিয়া ঠেলিয়া তুলিতে লাগিল— ‘অমল আজ বাদে কাল চলিয়া যাইবে, তবু এ কয়দিন তাহার দেখা নাই। আমাদের মধ্যে যে পরস্পর একটা মনান্তর হইয়াছে সেটা মিটাইয়া লইবার আর অবসরও হইল না।’ চারু প্রতিক্ষণে মনে করে অমল আপনি আসিবে— তাহাদের এতদিনকার খেলাধুলা এমন করিয়া ভাঙিবে না, কিন্তু অমল আর আসেই না। অবশেষে যখন যাত্রার দিন অত্যন্ত নিকটবতী হইয়া আসিল তখন চারু নিজেই অমলকে ডাকিয়া পাঠাইল । অমল বলিল,“আর একটু পরে যাচ্ছি।” চারু তাহদের সেই বারান্দার চৌকিটাতে গিয়া বসিল । সকালবেলা হইতে ঘন মেঘ করিয়া গুমট হইয়া আছে— চারু তাহার খোলা চুল এলো করিয়া মাথায় জড়াইয়া একটা হাতপাখা লইয়া ক্লাস্ত দেহে অল্প অল্প বাতাস করিতে লাগিল । অত্যন্ত দেরি হইল। ক্রমে তাহার হাতপাখা আর চলিল না। রাগ দুঃখ অধৈর্য তাহার বুকের ভিতরে ফুটিয়া উঠিল। মনে মনে বলিল— নাই আসিল অমল, তাতেই বা কী। কিন্তু তবু পদশব্দ মাত্রেই তাহার মন দ্বারের দিকে ছুটিয়া যাইতে লাগিল । দূর গির্জায় এগারোটা বাজিয়া গেল। স্বানান্তে এখনই ভূপতি খাইতে আসিবে। এখনো আধ ঘণ্ট। সময় আছে, এখনো অমল যদি আসে। যেমন করিয়া হোক, তাহাদের কয়দিনকার নীরব ঝগড়া আজ মিটাইয়া ফেলিতেই হইবে— অমলকে এমনভাবে বিদায় দেওয়া যাইতে পারে না । এই সমবয়সি দেওর-ভাজের মধ্যে যে চিরন্তন মধুর সম্বন্ধটুকু আছে– অনেক ভাব, আড়ি, অনেক স্নেহের দৌরাত্ম্য, অনেক বিশ্রদ্ধ মুখালোচনায় বিজড়িত একটি চিরছায়াময় লতাবিতান— অমল সে কি আজ ধুলায় লুটাইয়া দিয়া বহুদিনের জন্ত বহুদূরে চলিয়া যাইবে। একটু পরিতাপ হইবে না ? তাহার তলে কি শেষ জলও সিঞ্চন করিয়া যাইবে না— তাহদের অনেকদিনের দেওর-ভাজ সম্বন্ধের শেষ অশ্রািজল ! আধঘণ্টা প্রায় অতীত হয়। এলো খোপা খুলিয়া খানিকটা চুলের গুচ্ছ চারু