পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/২৭৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ । ২৫৭ সপ্তদশ পরিচ্ছেদ বিলাত হইতে চিঠি আসিবার দিন কবে, এ খবর চারু সর্বদাই রাখিত। প্রথমে এডেন হইতে ভূপতির নামে একখানা চিঠি আসিল, তাহাতে অমল বউঠানকে প্রণাম নিবেদন করিয়াছে ; সুয়েজ হইতেও ভূপতির চিঠি আসিল, বউঠান তাহার মধ্যেও প্রণাম পাইল। মাণ্ট হইতে চিঠি পাওয়া গেল, তাহাতেও পুনশ্চ নিবেদনে বউঠানের প্রণাম আসিল । চারু অমলের একখানা চিঠিও পাইল না। ভূপতির চিঠিগুলি চাহিয়া লইয়া উলটিয়া পালটিয়া বারবার করিয়া পড়িয়া দেখিল— প্রণামজ্ঞাপন ছাড়া আর কোথাও তাহার সম্বন্ধে আভাসমাত্রও নাই । চারু এই কয়দিন যে একটি শাস্ত বিষাদের চন্দ্ৰাতপছায়ার আশ্রয় লইয়াছিল অমলের এই উপেক্ষায় তাহ ছিন্ন হইয়া গেল। অস্তরের মধ্যে তাহার হৃৎপিগুট লইয়া আবার যেন ছেড়াৰ্ছেড়ি আরম্ভ হইল। তাহার সংসারের কর্তব্যস্থিতির মধ্যে আবার ভূমিকম্পের আন্দোলন জাগিয়া উঠিল। এখন ভূপতি এক-একদিন অধরাত্রে উঠিয়া দেখে, চারু বিছানায় নাই। খুজিয় খুজিয়া দেখে, চারু দক্ষিণের ঘরের জানালায় বসিয়া অাছে। তাহাকে দেখিয়া চারু তাড়াতাড়ি উঠিয়া বলে, “ঘরে আজ যে গরম, তাই একটু বাতাসে এসেছি।” ভূপতি উদবিগ্ন হইয়া বিছানায় পাখা টানার বন্দোবস্ত করিয়া দিল, এবং চারুর স্বাস্থ্যভঙ্গ আশঙ্কা করিয়া সর্বদাই তাহার প্রতি দৃষ্টি রাখিল। চারু হাসিয়া বলিত, "আমি বেশ আছি, তুমি কেন মিছামিছি ব্যস্ত হও।” এই হাসিটুকু ফুটাইয়া তুলিতে তাহার বক্ষের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করিতে হইত। অমল বিলাতে পৌছিল। চারু স্থির করিয়াছিল, পথে তাহাকে স্বতন্ত্র চিঠি লিখিবার যথেষ্ট সুযোগ হয়তো ছিল না, বিলাতে পৌছিয়া অমল লম্বা চিঠি লিখিবে। কিন্তু সে লম্বা চিঠি আসিল না। مd প্রত্যেক মেল আসিবার দিনে চারু তাহার সমস্ত কাজকর্ম কথাবার্তার মধ্যে ভিতরে ভিতরে ছট্‌ফটু করিতে থাকিত। পাছে ভূপতি বলে, “তোমার নামে চিঠি নাই’ এইজন্ত সাহস করিয়া ভূপতিকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে পারিত না । এমন অবস্থায় একদিন চিঠি আসিবার দিনে ভূপতি মনাগমনে আসিয়া মৃদুহাস্তে কহিল, “একটা জিনিস আছে, দেখবে ?” চারু ব্যস্তসমস্ত চমকিত হইয়া কহিল, “কই দেখাও।”