পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩২৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ ○o ○ শশধর । প্রকৃতির কঠোর শিক্ষাই যদি একমাত্র শিক্ষা হত তবে বিধাতা বাপমায়ের মনে স্নেহটুকু দিতেন না । মন্মথ, তুমি যে দিনরাত কর্মফল কর্মফল করে। আমি তা সম্পূর্ণ মানি না। প্রকৃতি আমাদের কাছ হতে কর্মফল কড়ায় গণ্ডায় আদায় করে নিতে চায় কিন্তু প্রকৃতির উপরে যিনি কর্তা আছেন তিনি মাঝে পড়ে তার অনেকটাই মহকুপ দিয়ে থাকেন, নইলে কর্মফলের দেনা শুধতে শুধতে আমাদের অস্তিত্ব পর্যন্ত বিকিয়ে যেত। বিজ্ঞানের হিসাবে কর্মফল সত্য, কিন্তু বিজ্ঞানের উপরেও বিজ্ঞান আছে, সেখানে প্রেমের হিসাবে ফলাফল সমস্ত অন্যরকম । কর্মফল নৈসর্গিক, মার্জনাটা তার উপরের কথা । মন্মথ । যিনি অনৈসৰ্গিক মানুষ তিনি যা খুশি করবেন, আমি অতি সামান্য নৈসৰ্গিক, আমি কর্মফল শেষ পর্যন্তই মানি । শশধর । আচ্ছা, আমি যদি সতীশের দেন। শোধ করে তাকে খালাস করি, তুমি কী করবে । মন্মথ । আমি তাকে ত্যাগ করব । দেখো, সতীশকে আমি যে ভাবে মানুষ করতে চেয়েছিলেম প্রথম হতেই বাধা দিয়ে তোমরা তা ব্যর্থ করেছ। এক দিক হতে সংযম আর-এক দিক হতে প্রশ্রয় পেয়ে সে একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। ক্রমাগতই ভিক্ষা পেয়ে যদি তার সম্মানবোধ এবং দায়িত্ববোধ চলে যায়, যে কাজের ষে পরিণাম তোমরা যদি মাঝে পড়ে কিছুতেই তাকে তা বুঝতে না দাও, তবে তার আশা আমি ত্যাগ করলেম । তোমাদের মতেই তাকে মানুষ করো— দুই নৌকোয় পা দিয়েই তার বিপদ ঘটেছে । শশধর । ও কী কথা বলছ মন্মথ– তোমার ছেলে— মন্মথ। দেখো শশধর, নিজের প্রকৃতি ও বিশ্বাস —মতেই নিজের ছেলেকে আমি মানুষ করতে পারি, অন্ত কোনো উপায় তো জানি না। যখন নিশ্চয় দেখছি তা কোনোমতেই হবার নয়, তখন পিতার দায়িত্ব আমি আর রাখব না। আমার যা সাধ্য তার বেশি আমি করতে পারব না । মন্মথর প্রস্থান শশধর । কী করা যায়। ছেলেটাকে তো জেলে দেওয়া যায় না। অপরাধ মামুষের পক্ষে যত সর্বনেশেই হোক, জেলখানা তার চেয়ে ঢের বেশি।