পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৩৮৯

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


o গল্পগুচ্ছ WENON দক্ষিণহস্তের উপর একরাশি পিতল্পর্কাসার থালা বাটি লইয়া ঘাটে আনিয়া উপস্থিত করিতেছে। 啤 মৃত্যুঞ্জয় দ্বারে আঘাত করিয়া ডাকিতে লাগিল, “ওগো সন্ন্যাসীঠাকুর, আছ কি।” দ্বার খুলিয়া গেল। সন্ন্যাসী কহিলেন, “কী চাও।” মৃত্যুঞ্জয় কহিল, “আমি বাহিরে যাইতে চাই– কিন্তু সঙ্গে এই সোনার দুটােএকটা পাতও কি লইয়! যাইতে পারিব না।” 。# সন্ন্যাসী তাহার কোনো উত্তর না দিয়া নূতন মশাল জালাইলেন– পূর্ণ কমণ্ডলু একটি রাখিলেন আর উত্তরীয় হইতে কয়েক মুষ্টি চিড়া মেজের উপর রাখিয়া বাহির হইয়া গেলেন। দ্বার বন্ধ হইয়া গেল । মৃত্যুঞ্জয় পাতলা একটা সোনার পাত লইয়া তাহা দোমড়াইয়া খণ্ড খণ্ড করিয়া ভাঙিয়া ফেলিল। সেই খণ্ড সোনাগুলাকে লইয়া ঘরের চারি দিকে লোষ্ট্রখণ্ডের মতো ছড়াইতে লাগিল। কখনো বা দাত দিয়া দংশন করিয়া সোনার পাতের উপর দাগ করিয়া দিল। কখনো বা একটা সোনার পাত মাটিতে ফেলিয়া তাহার উপরে বারম্বার পদাঘাত করিতে লাগিল। মনে মনে বলিতে লাগিল, পৃথিবীতে এমন সম্রাট কয়জন আছে যাহারা সোনা লইয়া এমন করিয়া ফেলাছড়া করিতে পারে। মৃত্যুঞ্জয়ের ষেন একটা প্রলয়ের রোথ চাপিয়া গেল। তাহার ইচ্ছা করিতে লাগিল, এই রাণীকৃত সোনাকে চূর্ণ করিয়া ধূলির মতো সে বাটা দিয়া বাট দিয়া উড়াইয়া ফেলে— আর এইরূপে পৃথিবীর সমস্ত সুবর্ণলুব্ধ রাজা-মহারাজকে সে অবজ্ঞা করিতে পারে। এমনি করিয়া যতক্ষণ পারিল মৃত্যুঞ্জয় সোনাগুলাকে লইয়া টানাটানি করিয়া প্রাস্তদেহে ঘুমাইয়া পড়িল । ঘুম হইতে উঠিয়া সে আবার তাহার চারি দিকে সেই সোনার স্তৃপ দেখিতে লাগিল। সে তখন দ্বারে আঘাত করিয়া চিৎকার করিয়া বলিয়া উঠিল, “ওগো সন্ন্যাসী, আমি এ সোনা চাই না— সোনা চাই না !” কিন্তু দ্বার খুলিল না। ডাকিতে ডাকিতে মৃত্যুঞ্জয়ের গলা ভাঙিয়া গেল, কিন্তু দ্বার খুলিল না— এক-একটা সোনার পিগু লইয়া দ্বারের উপর ছুড়িয়া মারিতে লাগিল, কোনো ফল হইল না। মৃত্যুঞ্জয়ের বুক দমিয়া গেল— তবে আর কি সন্ন্যাসী আসিবে না। এই স্বর্ণকারাগারের মধ্যে তিলে তিলে পলে পলে শুকাইয়া মরিতে হইবে ! তখন সোনাগুলাকে দেখিয়া তাহার আতঙ্ক হইতে লাগিল। বিভীষিকার নিঃশব্দ কঠিন হাস্তের মতে ওই সোনার স্তৃপ চারি দিকে স্থির হইয়া রহিয়াছে— তাহার মধ্যে ম্পন্দন নাই, পরিবর্তন নাই— মৃত্যুঞ্জয়ের ষে হৃদয় এখন কঁাপিতেছে, ব্যাকুল হইতেছে, তাহার সঙ্গে উহাদের কোনো সম্পর্ক নাই, বেদনার কোনো সম্বন্ধ নাই। এই সোনার