পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪১৩

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


গল্পগুচ্ছ ○● কোনো স্নেহের নিদর্শন এই বিন্দ্রপকারীদের হাতে পড়ে। তাহার মা তাহাকে ষে খাবার জিনিসগুলি দিয়াছেন এ তাহার পক্ষে অমৃত— কিন্তু এ-সমস্তই তাহার দরিদ্র গ্রাম্যম্বরের আদরের ধন ; যে আধারে সেগুলি রক্ষিত সেই ময়দা দিয়া আঁটা সরা-ঢাকা হাড়ি, তাহার মধ্যেও শহরের ঐশ্বৰ্যসজ্জার কোনো লক্ষণ নাই, তাহ কাচের পাত্র নয়, তাহা চিনামাটির ভাণ্ডও নহে— কিন্তু এইগুলিকে কোনো শহরের ছেলে যে অবজ্ঞা করিয়া দেখিবে ইহা তাহার পক্ষে একেবারেই অসহ। আগের বারে তাহার এইসমস্ত বিশেষ জিনিসগুলিকে তক্তাপোশের নীচে পুরানো খবরের কাগজ প্রভৃতি চাপ৷ দিয়া প্রচ্ছন্ন করিয়া রাখিত। এবারে তালাচাবির আশ্রয় লইল। যখন সে পাচমিনিটের জন্তও ঘরের বাহিরে যাইত ঘরে তালা বন্ধ করিয়া যাইত। এটা সকলেরই চোখে লাগিল। শৈলেন বলিল, “ধনরত্ব তো বিস্তর । ঘরে ঢুকিলে চোরের চক্ষে জল আসে— সেই ঘরে ঘন ঘন তালা পড়িতেছে— একেবারে দ্বিতীয় ব্যাঙ্ক অব বেঙ্গল হইয়া উঠিল দেখিতেছি । আমাদের কাহাকেও বিশ্বাস নাই– পাছে ওই পাবনার ছিটের চায়নাকোটটার লোভ সামলাইতে না পারি। ওহে রাধু, ওকে একটা ভদ্রগোছের নূতন কোট কিনিয়া না দিলে তো কিছুতেই চলিতেছে না। চিরকাল ওর ওই একমাত্র কোট দেখিতে দেখিতে আমার বিরক্ত ধরিয়া গেছে।” শৈলেন কোনোদিন কালীপদর ওই লোনাধর চুনবালি-খসা অন্ধকার ঘরটার মধ্যে প্রবেশ করে নাই। সিড়ি দিয়া উপরে উঠিবার সময় বাহির হইতে দেখিলেই তাহার সর্বশরীর সংকুচিত হইয়া উঠিত। বিশেষত সন্ধ্যার সময় যখন দেখিত একটা টিম্টমে প্রদীপ লইয়া একল৷ সেই বায়ুশূন্ত বদ্ধ ঘরে কালীপদ গা খুলিয়া বসিয়া বইয়ের উপর ঝু কিয়া পড়িয়া পড়া করিতেছে তখন তাহার প্রাণ হাপাইয়া উঠিত। দলের লোককে শৈলেন বলিল, “এবারে কালীপদ কোন সাতরাজার-ধন মানিক আহরণ করিয়া আনিয়াছে সেটা তোমরা খুজিয়া বাহির করে।” এই কৌতুকে সকলেই উৎসাহ প্রকাশ করিল। . কালীপদর ঘরের তালাটি নিতান্তই অল্প দামের তালা— তাহার নিষেধ খুব প্রবল নিষেধ নহে— প্রায় সকল চাবিতেই এ তালা খোলে। একদিন সন্ধ্যার সময় কালীপদ যখন ছেলে পড়াইতে গিয়াছে সেই অবকাশে জনদুই-তিন অত্যন্ত আমুদে ছেলে হাসিতে হাসিতে তালা খুলিয়া একটা লণ্ঠন হাতে তাহার ঘরে প্রবেশ করিল। তক্তাপোশের নীচে হইতে আচার চাটনি আমসত্ব প্রভৃতির ভাণ্ডগুলিকে আবিষ্কার করিল। কিন্তু সেগুলি যে বহুমূল্য গোপনীয় সামগ্ৰী তাহা তাহাজের মনে হইল না। খুজিতে খুজিতে বালিশের নীচে হইতে রিংসমেত এক চাবি বাহির হইল। সেই