পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪২২

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8 ०२ রবীন্দ্র-রচনাবলী ছিল—কোনো-এক সময়ে তাহদের প্রচুর ঐশ্বৰ্ষ ছিল এ কথা লইয়া বৃথা গর্ব করিতে তাহার ভারি লজ্জা বোধ হইত। আমরা গরিব, এ কথাটাকে কোনো কিন্তু দিয়া । চাপা দিতে সে মোটেই রাজি ছিল না। ভবানীচরণও যে র্তাহীদের ঐশ্বর্যের দিনের কথা গর্ব করিয়া পাড়িতেন তাহা নহে। কিন্তু সে যে র্তাহার সুখের দিন ছিল, তখন তাহার যৌবনের দিন ছিল। বিশ্বাসঘাতক সংসারের বীভৎসমূর্তি তখনো ধরা পড়ে নাই। বিশেষত খামাচরণের স্ত্রী, তাহার পরমস্নেহশালিনী ভ্রাতৃজায় রমাসুন্দরী, যখন তাহাদের সংসারের গৃহিণী ছিলেন, তখন সেই লক্ষ্মীর ভরা ভাণ্ডারের দ্বারে দাড়াইয়া কী অজস্র আদরই তাহারা লুটিয়াছিলেন– সেই অস্তমিত মুখের দিনের স্মৃতির ছটাতেই তো ভবানীচরণের জীবনের সন্ধ্যা সোনায় মণ্ডিত হইয়া আছে। কিন্তু এই-সমস্ত স্থখস্থতি আলোচনার মাঝখানে ঘুরিয়া ফিরিয়া কেবলই সেই উইল-চুরির কথাটা আসিয়া পড়ে। ভবানীচরণ এই প্রসঙ্গে ভারি উত্তেজিত হইয়া পড়েন । এখনো সে উইল পাওয়া যাইবে এ সম্বন্ধে তাহার মনে লেশমাত্র সন্দেহ নাই— তাহার সতীসাধ্বী মার কথা কখনোই ব্যর্থ হইবে না। এই কথা উঠিয়া পড়িলেই কালীপদ মনে মনে অস্থির হইয়া উঠিত। সে জানিত এটা তাহার পিতার একটা পাগলামিমাত্র। তাহারা মায়ে ছেলেয় এই পাগলামিকে আপসে প্রশ্রয়ও দিয়াছে, কিন্তু শৈলেনের কাছে তাহার পিতার এই দুর্বলতা প্রকাশ পায় এ তাহার কিছুতেই ভালো লাগে না । কতবার সে পিতাকে বলিয়াছে, “না বাবা, ওটা তোমার একটা মিথ্যা সন্দেহ।” কিন্তু এরূপ তর্কে উলটা ফল হইত। তাহার সন্দেহ যে অমূলক নহে তাহা প্রমাণ করিবার জন্য সমস্ত ঘটনা তিনি তন্ন তন্ন করিয়া বিবৃত করিতে থাকিতেন। তখন কালীপদ নানা চেষ্টা করিয়াও কিছুতেই তাহাকে থামাইতে পারিত না। বিশেষত কালীপদ ইহা স্পষ্ট লক্ষ্য করিয়া দেখিয়াছে যে, এই প্রসঙ্গটা কিছুতেই শৈলেনের ভালো লাগে না। এমন-কি, সে’ও বিশেষ একটু যেন উত্তেজিত হইয়া ভবানীচরণের যুক্তি খগুন করিতে চেষ্টা করিত। অন্য সকল বিষয়েই ভবানীচরণ আর-সকলের মত মানিয়া লইতে প্রস্তুত আছেন— কিন্তু এই বিষয়টাতে তিনি কাহারো কাছে হার মানিতে পারেন না। র্তাহার ম৷ লিখিতে পড়িতে জানিতেন— তিনি নিজের হাতে র্তাহার পিতার উইল এবং অন্ত দলিলট বাক্সে বন্ধ করিয়া লোহার সিন্দুকে তুলিয়াছেন; অথচ তাহার সামনেই মা যখন বাক্স খুলিলেন তখন দেখা গেল অন্ত দলিলটা যেমন ছিল তেমনি আছে অথচ উইলট নাই, ইহাকে চুরি বলা হইবে না তে কী। কালীপদ তাহকে ঠাও করিবার জন্ত বলিত, “তা, বেশ তো বাবা, যারা তোমার বিষয় ভোগ করিতেছে তারা তো তোমারই ছেলেরই মতে, তারা তো