পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৪৬

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


8२७ 縣 রবীন্দ্র-রচনাবলী কালে চামড়ার শৌখিন বিলাতি জুতা। ডিষ্ট্রিক্ট বোর্ডের পাকা রাস্ত বাহিয়া দ্রুতবেগে সে বাইসিকূল চালাইয়া আসিল ; গ্রামের কাচা রাস্তায় আসিয়া তাহাকে বেগ কমাইতে হইল। গ্রামের লোকে হঠাৎ তাহার বেশভূষা দেখিয়া তাহাকে চিনিতেই পারিল না । সেও কাহাকেও কোনো সম্ভাষণ করিল না ; তাহার ইচ্ছা অন্ত লোকে তাহাকে চিনিবার আগেই সর্বাগ্রে সে তাহার দাদার সঙ্গে দেখা করিবে । বাড়ির কাছাকাছি যখন সে আসিয়াছে তখন ছেলেদের চোখ সে এড়াইতে পারিল না। তাহার এক মুহূর্তেই তাহাকে চিনিতে পারিল । সৌরভীদের বাড়ি কাছেই ছিল— ছেলেরা সেই দিকে ছুটিয়া চেচাইতে লাগিল, “সৈরিদিদির বর এসেছে, সৈরিদিদির বর।” গোপাল বাড়িতেই ছিল, সে ছুটিয়া বাহির হইয়া আসিবার পূর্বেই বাইসিকূল রসিকদের বাড়ির সামনে আসিয়া থামিল। তখন সন্ধ্যা হইয়া আসিয়াছে, ঘর অন্ধকার, বাহিরে তালা লাগানো । জনহীন পরিত্যক্ত বাড়ির ষেন নীরব একটা কান্না উঠিতেছে— কেহ নাই, কেহ নাই । এক নিমেষেই রসিকের বুকের ভিতরটা কেমন করিয়া উঠিয়া চোখের সামনে সমস্ত অস্পষ্ট হইয়া উঠিল। তাহার পা কঁাপিতে লাগিল ; বন্ধ দরজা ধরিয়া সে দাড়াইয়া রহিল, তাহার গলা শুকাইয়া গেল, কাহাকেও ডাক দিতে সাহস হইল না। দূরে মন্দিরে সন্ধ্যারতির যে কাসরঘণ্টা বাজিতেছিল, তাহ যেন কোন একটি গতজীবনের পরপ্রাস্ত হইতে সুগভীর একটা বিদায়ের বার্তা বহিয়া তাহার কানের কাছে আসিয়া পৌছিতে লাগিল। সামনে যাহা-কিছু দেখিতেছে, এই মাটির প্রাচীর, এই চালাঘর, এই রুদ্ধ কপাট, এই জিগরগাছের বেড়া, এই হেলিয়া-পড়া খেজুরগাছ— সমস্তই যেন একটা হারানো সংসারের ছবিমাত্র, কিছুই যেন সত্য নহে। গোপাল কাছে আসিয়া দাড়াইল । রসিক পাংশুমুখে গোপালের মুখের দিকে চাহিল, গোপাল কিছু না বলিয়া চোখ নিচু করিল। রসিক বলিয়া উঠিল, “বুঝেছি, বুঝেছি– দাদা নাই।” আমনি সেইখানেই দরজার কাছে সে বসিয়া পড়িল। গোপাল তাহার পাশে বসিয়া কহিল, "ভাই রসিকদাদা, চলে আমাদের বাড়ি চলে।” রসিক তাহার দুই হাত ছাড়াইয়া দিয়া সেই দরজার সামনে উপুড় হইয়া মাটিতে লুটাইয়া পড়িল। দাদা ! দাদা ! দাদা ! যে দাদা তাহার পায়ের শব্দটি পাইলে আপনিই ছুটিয়া আসিত কোথাও তাহার কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। গোপালের বাপ আসিয়া অনেক বলিয়া কহিয়া রসিককে বাড়িতে লইয়া আসিল । রলিক সেখানে প্রবেশ করিয়াই মুহূর্তকালের জন্য দেখিতে পাইল, সৌরভ সেই তাহার চিত্রিত কাথায় মোড়া কী একটা জিনিস অতি স্বত্বে রোয়াকের দেয়ালে ঠেসান দিয়৷