পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৫৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


{} পারস্তে 806. মানুষ পশু পাখি কিছু ৰে পৃথিবীতে আছে সে আর লক্ষ্য হয় না। শব্দ নেই, গতি নেই, প্রাণ নেই ; যেন জীববিধাতার পরিত্যক্ত পৃথিবী তালি-দেওয়া চাদরে ঢাকা । ষত উপরে উঠছে ততই পৃথিবীর রূপবৈচিত্র্য কতকগুলো আঁচড়ে এসে ঠেকল। বিস্মৃতনামা প্রাচীন সভ্যতার স্মৃতিলিপি যেন অজ্ঞাত অক্ষরে কোনো মৃতদেশের প্রান্তর জুড়ে খোদিত হয়ে পড়ে আছে ; তার রেখা দেখা যায়, অর্থ বোঝা शांशू मां । 聯 প্রায় দশটা। এলাহাবাদের কাছাকাছি এসে বায়ুযান নামবার মুখে ঝুকিল । ডাইনের জানলা দিয়ে দেখি নীচে কিছুই নেই, শুধু অতল নীলিমা, বা দিকে আড় হয়ে উপরে উঠে আসছে ভূমিতলট । খেচর-রথ মাটিতে ঠেকল এসে ; এখানে সে চলে লাফাতে লাফাতে, ধাক্কা খেতে খেতে ; অপ্রসন্ন পৃথিবীর সম্মতি সে পায় না যেন। শহর থেকে জায়গাটা দূরে। চার দিক ধৃ ধূ করছে। রৌদ্রতপ্ত বিরস পৃথিবী। নামবার ইচ্ছা হল না। কোম্পানির একজন ভারতীয় ও একজন ইংরেজ কর্মচারী আমার ফোটো তুলে নিলে। তার পরে খাতায় দু-চার লাইন স্বাক্ষরের দাবি করল যখন, আমার হাসি পেল। আমার মনের মধ্যে তখন শংকরাচার্যের মোহমুদগরের শ্লোক গুঞ্জরিত। উধ্ব থেকে এই কিছু আগেই চোখে পড়েছে নিজীব ধূলিপটের উপর অদৃপ্ত জীবলোকের গোটকতক স্বাক্ষরের আঁচড়। যেন ভাবী যুগাবসানের প্রতিবিম্ব পিছন ফিরে বর্তমানের উপর এসে পড়েছে। যে ছবিটা দেখলেম সে একটা বিপুল রিক্ততা ; কালের সমস্ত দলিল অবলুপ্ত ; স্বয়ং ইতিবৃত্তবিং চিরকালের ছুটিতে অনুপস্থিত ; রিসার্চ-বিভাগের ভিতটা-মৃদ্ধ তলিয়ে গেছে মাটির নীচে। এইখানে যন্ত্রটা পেট ভরে তৈল পান করে নিলে। আধঘণ্টা থেমে আবার আকাশযাত্রা শুরু । এতক্ষণ পর্যন্ত রথের নাড়া তেমন অনুভব করি নি, ছিল কেবল তার পাথার দুঃসহ গর্জন। দুই কানে তুলো লাগিয়ে জানলা দিয়ে চেয়ে দেখছিলুম। সামনের কেদারায় ছিলেন একজন দিনেমার, ইনি ম্যানিলা দ্বীপে আখের খেতের তদারক করেন, এখন চলেছেন স্বদেশে। গুটোনে। ম্যাপ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে যাত্রাপথের পরিচয় নিচ্ছেন ; ক্ষণে ক্ষণে চলছে চীজ রুটি, চকোলেটের মিষ্টান্ন, খনিজাত পানীয় জল। কলকাতা থেকে বহুবিধ খবরের কাগজ সংগ্রহ করে এনেছেন, আগাগোড়া তাই তন্ন তন্ন করে পড়ছেন একটার পর একটা । যাত্রীদের মধ্যে আলাপের সম্বন্ধ রইল না। বস্তুহুংকারের তুফানে কথাবার্তা যায় তলিয়ে। এক কোণে বেতারবাতিক কানে ঠুলি লাগিয়ে কখনো কাজে কখনো ঘুমে কখনো পাঠে মগ্ন। বাকি তিনজন পালাক্রমে