পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (দ্বাবিংশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৯৪

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


b~२ রবীন্দ্র-রচনাবলী আসি নি। দানের জোয়ার যখন লাগে অতল জলে তখন ঘাটে ঘাটে দানের বোঝাইতরী রশি খুলে দিয়ে ভেসে পড়ে। আমাদের ভরা নৌকো দখিন হাওয়ায় পাল তুলে সাগর-মুখে হল, সেই কথাটা কণ্ঠ খুলে জানিয়ে দাও । ফাগুন, তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি-যে দান ভরে দাও একেবারে ভরে দাও, কোথাও কিছু সংকোচ না থাকে। পূর্ণের উংসবে দেওয়া আর পাওয়া একই কথা। ঝর্নার এক প্রাস্তে পাওয়া রয়েছে অভ্ৰভেদী শিখরের দিক থেকে, আর-এক প্রান্তে দেওয়া রয়েছে অতলম্পর্শ সাগরের দিকে, এর মাঝখানে তো কোনো বিচ্ছেদ নেই। অন্তহীন পাওয়া আর অন্তহীন দেওয়ার আবর্তন নিয়ে এই বিশ্ব । গানের ডালি ভরে দে গে৷ উষার কোলে মধুরিমা, দেখে, দেখো, চাদের তরণীতে আজ পূর্ণত পরিপুঞ্জিত। কত দিন ধরে এক তিথি থেকে আর-এক তিথিতে এগিয়ে এগিয়ে আসছে । নন্দনবন থেকে আলোর পারিজাত ভরে নিয়ে এল— কোন মাধুরীর মহাশ্বেত সেই ডালি কোলে নিয়ে বসে আছে ; ক্ষণে ক্ষণে রাজহংসের ডানার মতো তার শুভ্র মেঘের বসনপ্রাস্ত আকাশে এলিয়ে পড়ছে। আজ ঘুমভাঙা রাতের বঁশিতে বেহাগের তান লাগল। নিবিড় অমা-তিমির হতে দোল লেগেছে এবার। পাওয়া আর না-পাওয়ার মাঝখানে দোল । এক প্রাস্তে বিরহ, আর প্রান্তে মিলন, স্পর্শ করে করে দুলছে বিশ্বের হৃদয়। পরিপূর্ণ আর অপূর্ণের মাঝখানে এই দোলন। আলোতে ছায়াতে ঠেকতে ঠেকতে রূপ জাগছে— জীবন থেকে মরণে, মরণ থেকে জীবনে, অন্তর থেকে বাহিরে, আবার বাহির থেকে অন্তরে। এই দোলার তালে না মিলিয়ে চললেই রসভঙ্গ হয়। ও পাড়ার ওরা-ষে দরজার আগল এটে বসেই রইল— হিসেবের খাতার উপর ঝুকে পড়েছে। একবার ওদের দরজার বাইরে দাড়িয়ে দোলের ডাক দাও । ওরে গৃহবাসী, তোরা খোল দ্বার খোল কিন্তু পুর্ণিমার চাদ-যে ধ্যানস্তিমিতলোচন পুরোহিতের মতো আকাশের বেদীতে বসে উৎসবের মন্ত্র জপ করতে লাগল। ওকে দেখাচ্ছে যেন জ্যোৎস্বাসমূত্রের ঢেউয়ের চূড়ায় ফেনপুঞ্জের মতো— কিন্তু সে ঢেউ-যে চিত্রাপিতবং স্তব্ধ। এ দিকে অাজ বিশ্বের বিচলিত চিত্ত দক্ষিণের হাওয়ায় ভেসে পড়েছে, চঞ্চলের দল মেতেছে বনের শাখায়, পাখির ডানায়— আর ওই কি এক অবিচলিত হয়ে থাকবে নিবাতনিষ্কম্পমিবপ্রদীপম ? নিজে মাতবে না আর বিশ্বকে মাতাবে, সে কেমন হল ?