পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (পঞ্চদশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৫৮

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


888 রবীন্দ্র-রচনাবলী এইজন্যে দৃঢ়বিশ্বাসী লোকের কাজকর্মে জোর আছে, কিন্তু উদ্বেগ নেই। সে মনের মধ্যে নিশ্চয় অনুভব করে, তার একটা দাড়াবার জায়গা আছে, পৌছবার স্থান আছে। প্রত্যক্ষ ফল সে না দেখতে পেলেও সে মনে-মনে জানে, ফল থেকে সে বঞ্চিত হয় নি— বিরুদ্ধ ফল পেলেও সেই বিরুদ্ধতাকে সে একান্ত করে দেখে না, তার ভিতর থেকেও একটি সার্থকতার প্রত্যয় মনে থাকে। একটি অত্যন্ত বড়ো জায়গায় চিত্তের দৃঢ়নির্ভরতা, এই জায়গাটিকে ধ্রুবসত্য বলে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা, এই হচ্ছে সেই বিশ্বাস যে-মাটির উপরে আমাদের ধর্মসাধনা প্রতিষ্ঠিত। এই বিশ্বাসটির মুলে একটি উপলব্ধি আছে। সেটি হচ্ছে এই যে, ঈশ্বর সত্য। কথাটি শুনতে সহজ, এবং শোনাবামাত্রই অনেকে হয়তো বলে উঠবেন যে, ঈশ্বর সত্য, এ কথা তো আমরা অস্বীকার করি নে। পদে পদেই অস্বীকার করি । ঈশ্বর সত্য নন, এইভাবেই প্রতিদিন আমরা সংসারের কাজ করে থাকি । ঈশ্বর সত্য, এই উপলব্ধিটির উপরে আমরা ভর দিতে পারি নে। আমাদের মন সেই পর্যন্ত পৌছে সেখানে গিয়ে স্থিতি করতে পারে না । আমার যাই ঘটুক না কেন, যিনি চরমসত্য পরমসত্য তিনি আছেন এবং তার মধ্যেই আমি আছি, এই ভরসাটুকু সকল অবস্থাতেই যার মনের মধ্যে লেগেই আছে, সে ব্যক্তি যেমনভাবে জীবনের কাজ করে, আমরা কি তেমনভাবে করে থাকি — আছেন, আছেন, তিনি আছেন, তিনি আমার হয়েই আছেন— সকল দেশে সকল কালেই তিনি আছেন এবং তিনি আমারি আছেন— জীবনে যত উলটপালটই হ’ক, এই সত্যটি থেকে কেউ আমাকে কিছুমাত্র বঞ্চিত করতে পারবে না, এমন জোর এমন ভরসা যার আছে সেই হচ্ছে বিশ্বাসী ; তিনি আছেন, এই সত্যের উপরে সে বিশ্রাম করে এবং তিনি আছেন, এই সত্যের উপরেই সে কাজ করে। কিন্তু ঈশ্বর-যে কেবল সত্যরূপে সকলকে দৃঢ় করে ধারণ করে রেখেছেন, সকলকে আশ্রয় দিয়েছেন, এই কথাটিই সম্পূর্ণ কথা নয় । এই জীবধাত্রী পৃথিবী খুব শক্ত বটে— এর ভিত্তি অনেক পাথরের স্তর দিয়ে গড় । এই কঠিন দৃঢ়তা না থাকলে এর উপরে আমরা এমন নি:সংশয়ে ভর দিতে পারতুম না। কিন্তু এই কাঠিন্যই যদি পৃথিবীর চরমরূপ হত, তা-হলে তো এ একটি প্রস্তরময় ভয়ংকর মরুভূমি হয়ে থাকত। এর সমস্ত কাঠিন্তের উপরে একটি রসের বিকাশ আছে– সেইটেই এর চরম পরিণতি। সেটি কোমল, সেটি সুন্দর, সেটি বিচিত্র। সেইখানেই নৃত্য, সেইখানেই গান, সেইখানেই সাজসজ্জা । পৃথিবীর সার্থকরূপটি এইখানেই প্রকাশ পেয়েছে।