পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (পঞ্চদশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৬০

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


88や রবীন্দ্র-রচনাবলী ধর্মসাধনারও চরম পরিচয় যেখানে তার শ্ৰী প্রকাশ পায়। এই শ্ৰী জিনিসটি রসের জিনিস। তার মধ্যে অভাবনীয় বিচিত্রতা এবং অনির্বচনীয় মাধুর্য ও তার মধ্যে নিত্যচলনশীল প্রাণের লীলা ! শুষ্কতায় অনম্ৰতায় তার সৌন্দর্যকে লোপ করে, তার সচলতাকে রোধ করে, তার বেদনাবোধকে অসাড় করে দেয়। ধর্মসাধনার যেখানে উৎকর্ষ সেখানে গতির বাধাহীনতা, ভাবের বৈচিত্র্য এবং অক্ষুন্ন মাধুর্যের নিত্যবিকাশ । নম্রতা নইলে এই জিনিসটিকে পাওয়া যায় না। কিন্তু নম্রতা মানে শিক্ষিত বিনয় নয়। অর্থাৎ কঠিন লোহাকে পুড়িয়ে-পিটিয়ে তাকে ইস্পাতরূপে যে খরধার নমনীয়তা দেওয়া যায়, এ সে জিনিস নয়। সরস সজীব তরুশাখার যে-নম্রতা— যে-নম্রতার মধ্যে ফুল ফুটে ওঠে, দক্ষিণের বাতাস নৃত্যের আন্দোলন বিস্তার করে, শ্রাবণের ধারা সংগীতে মুখরিত হয় এবং সূর্যের কিরণ ঝংকৃত সেতারের স্বরগুলির মতো উৎক্ষিপ্ত হতে থাকে ; চারিদিকের বিশ্বের নানা ছন্দ যে-নম্রতার মধ্যে আপনার স্পন্দনকে বিচিত্র করে তোলে ; যে-নম্রতা সহজভাবে সকলের সঙ্গে আপনার যোগ স্বীকার করে, সায় দেয়, সাড়া দেয়, আঘাতকে সংগীতে পরিণত করে, এবং স্বাতন্ত্র্যকে সৌন্দর্যের দ্বারা সকলের অাপন করে তোলে। এক কথায় বলতে গেলে এই নম্রতাটি রসের নম্রতা— শিক্ষার নম্রতা নয়। এই নম্রতা শুষ্ক সংযমের বোঝায় নত নয়, সরস প্রাচুর্যের দ্বারাই নত ; প্রেমে ভক্তিতে আনন্দে পরিপূর্ণতায় নত। কঠোরতা যেমন স্বভাবতই আপনাকে স্বতন্ত্র রাখে, রস তেমনি স্বভাবতই অন্যের দিকে যায়। আনন্দ সহজেই নিজেকে দান করে— আনন্দের ধর্মই হচ্ছে সে আপনাকে অন্যের মধ্যে প্রসারিত করতে চায়। কিন্তু উদ্ধত হয়ে থাকলে কিছুতেই অন্যের সঙ্গে মিল হয় না— অন্যকে চাইতে গেলেই নিজেকে নত করতে হয়— এমন কি, যেরাজা যথার্থ রাজা, প্রজার কাছে তাকে নম্র হতেই হবে । রসের ঐশ্বর্ষে যে-লোক ধনী, নম্রতাই তার প্রাচুর্যের লক্ষণ । বিশ্বজগতের মধ্যে জগদীশ্বর কোনখানে আমাদের কাছে নত। যেখানে তিনি সুন্দর ; যেখানে রসোবৈ স: ; সেখানে আনন্দকে ভাগ না করে তার চলে না ; সেখানে নিজের নিয়মের জোরের উপরে কড়া হয়ে তিনি দাড়িয়ে থাকতে পারেন না ; সেখানে সকলের মাঝখানে নেমে এসে সকলকে তার ডাক দিতে হয় ; সেই ডাকের মধ্যে কত করুণা, কত বেদনা, কত কোমলতা ! স্নেহের আনন্দভারে দুর্বল ক্ষুদ্র শিশুর কাছে পিতামাতা যেমন নত হয়ে পড়েন, জগতের ঈশ্বর তেমনি করেই আমাদের দিকে নত হয়ে পড়েছেন। এইটেই হচ্ছে আমাদের কাছে সকলের চেয়ে বড়ো কথা ;–