পাতা:রবীন্দ্র-রচনাবলী (পঞ্চদশ খণ্ড) - বিশ্বভারতী.pdf/৪৮৭

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শান্তিনিকেতন 8ፃ ó তিমির দিগভরি ঘোর যামিনী, অথির বিজুরিক পাতিয়া। বিদ্যাপতি কহে, কৈসে গোঙায়বি হরি বিনে দিনরাতিয়া । প্রহরের পর প্রহর ধরে এই বার্তাই সে জানাচ্ছে, "ওরে, তুই-যে বিরহিণী— তুই বেঁচে আছিস কী করে, তোর দিনরাত্রি কেমন করে কাটছে।’ সেই চিরদিনরাত্রির হরিকেই চাই, নইলে দিনরাত্রি অনাথ । সমস্ত আকাশকে কাদিয়ে তুলে এই কথাটা আজ আর নিঃশেষ হতে চাচ্ছে না। আমরা যে তারি বিরহে এমন করে কাটাচ্ছি, এ খবরটা আমাদের নিতান্তই জানা চাই। কেননা বিরহ মিলনেরই অঙ্গ। ধোয়া যেমন আগুন জলার আরম্ভ, বিরহও তেমনি মিলনের আরম্ভ-উচ্ছ্বাস । খবর আমাদের দেয় কে। ওই-যে তোমার বিজ্ঞান যাদের মনে করছে, তারা প্রকৃতির কারাগারের কয়েদী, তারা পায়ে শিকল দিয়ে একজনের সঙ্গে আর-একজন বাধা থেকে দিনরাত্রি কেবল বোবার মতো কাজ করে যাচ্ছে— তারাই । যেই তাদের শিকলের শব্দ আমাদের হৃদয়ের ভিতরে গিয়ে প্রবেশ করে আমনি দেখতে পাই, এ-যে বিরহের বেদনাগান, এ-যে মিলনের আহবানসংগীত ৷ যে-সব খবরকে কোনো ভাষা দিয়ে বলা যায় না, সে-সব খবরকে এরাই তো চুপি চুপি বলে যায়— এবং মানুষ কবি সেইসব খবরকেই গানের মধ্যে কতকটা কথায়, কতকটা স্বরে, বেঁধে গাইতে থাকে : ভরা বাদর, মাহ ভাদর, শূন্ত মন্দির মোর ! আজ কেবলি মনে হচ্ছে এই-যে বর্ষা, এ তো এক সন্ধ্যার বর্ষ নয়, এ যেন আমার সমস্ত জীবনের অবিরল শ্রাবণধারা। যতদূর চেয়ে দেখি, আমার সমস্ত জীবনের উপরে সঙ্গিহীন বিরহসন্ধ্যার নিবিড় অন্ধকার— তারি দিগ্দিগন্তরকে ঘিরে অশ্রান্ত শ্রাবণের বর্ষণে প্রহরের পর প্রহর কেটে যাচ্ছে ; আমার সমস্ত আকাশ ঝর ঝর করে বলছে, কৈসে গোঙায়বি হরি বিনে দিনরাতিয়া। কিন্তু তবু এই বেদনা, এই রোদন, এই বিরহ একেবারে শূন্ত নয় ;– এই অন্ধকারের, এই শ্রাবণের বুকের মধ্যে একটি নিবিড় রস অত্যন্ত গোপনে ভরা রয়েছে ; একটি কোন বিকশিত বনের সজল গন্ধ আসছে, এমন একটি অনির্বচনীয় মাধুর্য— যা যখনি প্রাণকে ব্যথায় কাদিয়ে তুলছে, তখনি সেই বিদীর্ণ ব্যথার ভিতর থেকে অশ্রুসিক্ত আনন্দকে টেনে বের করে নিয়ে আসছে। *